বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও (মাসিক বেতনভুক্তি) নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্কুল ও কলেজের শীর্ষ প্রশাসনিক পদ—অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক—এ নিয়োগ পেতে এখন থেকে ন্যূনতম ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে বিকেলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞাপনও শিগগিরই জারি করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র।
অভিজ্ঞতার শর্ত বাড়ানো
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হতো। নতুন নীতিমালায় তা বাড়িয়ে ১৮ বছর করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আগে এসব শীর্ষ পদে নিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার-সমর্থিত একজন সংসদ সদস্য এবং বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের আপত্তির পর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়। পরে সমন্বিত সিদ্ধান্ত হিসেবে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমেই নিয়োগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অভিজ্ঞতার শর্ত বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ বা জুনিয়র শিক্ষকরা এগিয়ে যেতে পারেন—এমন ধারণা থেকেই অভিজ্ঞতার সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অধিক অভিজ্ঞ শিক্ষককে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কলেজ পর্যায়ের নতুন যোগ্যতা
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কলেজ পর্যায়ে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে হলে ডিগ্রি কলেজ বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রভাষক, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এ ছাড়া সাধারণ বিষয়ের প্রভাষকরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এসব পদে আবেদন করতে পারবেন। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার সাধারণ বিষয়ের প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপকরা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থাকলে অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
স্কুল পর্যায়ের নতুন নিয়ম
স্কুল পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে হলে মোট ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কমপক্ষে ২ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অন্যদিকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হতে হলে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান বা সহকারী প্রধান হিসেবে অন্তত ৩ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ম্যানেজিং কমিটিতে ফিরছে পুরোনো নিয়ম
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামোতেও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির জন্য ন্যূনতম স্নাতক পাসের শর্ত আরোপ করেছিল। তবে নতুন নীতিমালায় সেই বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হচ্ছে।
ফলে সভাপতির পদে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত আর থাকছে না। এতে কার্যত ২০২৪ সালের আগের নিয়মই পুনর্বহাল হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
নতুনভাবে গঠিত হবে কমিটি
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটিতে আবারও বিদ্যোৎসাহী সদস্য, দাতা সদস্য ও শিক্ষানুরাগী সদস্য পদ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বা শিক্ষাবান্ধব ব্যক্তিদের কমিটিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে এ ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ক্ষমতা আর থাকছে না। প্রতিষ্ঠানের প্রধান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অথবা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পাঠানো তিনজনের তালিকা থেকে একজনকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, তরুণ শিক্ষকদের তুলনায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের হাতে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব থাকলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আসবে।
অন্যদিকে অনেক সাধারণ শিক্ষক এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।
সভায় অংশ নেওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না। একই সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটি গঠনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ক্ষমতাও বাতিল করা হয়েছে।



