কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একসঙ্গে পাঁচজনের প্রাণহানিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে উপজেলার গাছবাড়ী ও আশপাশের এলাকায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ।
রোববার (২১ জুন) সকালে কাতারের শাহানিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা সবাই সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নুরের ছেলে জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ (২৭), একই গ্রামের মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ (২৮) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ (৩৩)।
নিহত জুবায়ের আহমদের পরিবারের শোক যেন সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে এলাকাবাসীকে। ১৪ বছর আগে প্রবাসে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। পরে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন বুনেছিলেন জুবায়ের। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে বাবার মতো তিনিও প্রবাসের মাটিতে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হলেন।
জুবায়েরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তার মা জাহানারা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “১৪ বছর আগে আমার স্বামীকে হারিয়েছি। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বড় করেছি। সংসারের হাল ধরবে বলে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এখন তাকেও হারালাম।”
চার বছরের শিশুসন্তান এখনও বুঝতে পারেনি, তার বাবা আর কখনও ফিরে আসবেন না। পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন আগেও দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন জুবায়ের। সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।
একই গ্রামের জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন স্ত্রী শাহিনা বেগম। তিনি বলেন, “আমাদের পুরো সংসার তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
অপর নিহত কাদির আহমদের বাবা বাহার উদ্দিন জানান, পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে চার বছর আগে কাতারে গিয়েছিলেন তার ছেলে। আগামী মাসেই দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু জীবিত নয়, মরদেহ হয়ে ফিরতে হবে তাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নিহত পাঁচজনই সাধারণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া এবং মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়েই তারা প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই তারা ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে।
কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো ভোরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তাদের বহনকারী একটি পাজেরো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত করছে স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ।
দুর্ঘটনার খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই কানাইঘাটজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একসঙ্গে পাঁচ তরুণ প্রবাসীর মৃত্যুতে পরিবারগুলোর পাশাপাশি পুরো এলাকাবাসী গভীর শোকে মুহ্যমান।
দুর্ঘটনার পর কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও হাসপাতালের মর্গ পরিদর্শন করেছেন। নিহতদের মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর জানান, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনই তার ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে কাতারে পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আরিফুল হক চৌধুরী। এক শোকবার্তায় তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। পাশাপাশি দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।



