দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে কোনো উদ্যোগ জনগণ প্রতিহত করবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে জোরপূর্বক কোনো শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে দেশের মানুষ ‘হিমালয়ের মতো’ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
শুক্রবার (১৯ জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারায়ণগঞ্জ মহানগর আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাদের আত্মত্যাগকে অসম্মান করা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের সরিয়ে দলীয় অনুগতদের নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একদলীয় শাসন কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হলে দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না।”
সংসদে বিরোধী দলের প্রতি নেতিবাচক রাজনৈতিক আচরণেরও সমালোচনা করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটূক্তিমূলক ভাষা ব্যবহার করত, বর্তমানে বিএনপির মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় বাজেট প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; সেটির কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা না গেলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী মহলে চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের রায়কে সম্মান করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। গণভোটে সমর্থন পাওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা থাকা উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের এক উপদেষ্টার বক্তব্য জনগণের রায় ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এখনো সময় আছে, জনগণের মতামতকে সম্মান করুন। অন্যথায় জোর করে শাসনব্যবস্থা চালানোর চেষ্টা করলে জনগণ আপনাদের সামনে হিমালয় পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে যাবে।”
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা থাকলে তাদের জোট আরও ভালো ফল অর্জন করতে পারত।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একসময় দেশের শিল্প রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ জেলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাস ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল জব্বারের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



