ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ডিসেম্বরকে ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সম্ভাব্য সহিংসতা ও যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কায় জেলার ১৪টি স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা কয়েক দফায় জানিয়েছেন, ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথাও বলেছেন তিনি। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায়, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে সংশয় রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
এদিকে গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অচল করার পরিকল্পনা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। কুমিল্লা অংশের অন্তত ১৪টি নির্জন ও কৌশলগত স্থানে যানবাহন ভাঙচুর, ককটেল নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন তথ্য পাওয়ার পরপরই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান। এরই মধ্যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমিল্লা অংশ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগাযোগপথ। এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পণ্য পরিবহন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে অতীতেও রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতার সময় সড়কটিকে কেন্দ্র করে সহিংস কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশনা ও অর্থায়নে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মহাসড়কের নির্জন এলাকাগুলোকে নাশকতার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যেসব ১৪টি স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে
কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৪টি স্থানকে সম্ভাব্য নাশকতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক স্থানগুলো হলো—
-
দাউদকান্দি: শহীদনগর, ইলিয়টগঞ্জ, পুটিয়া, তীরচর ও গোমতা।
-
চান্দিনা: মাধাইয়া ও কাঠেরপুল।
-
বুড়িচং: নিমসার ও কাবিলা।
-
আদর্শ সদর: সৈয়দপুর, আলেখারচর ও কোটবাড়ী।
-
সদর দক্ষিণ: পদুয়ার বাজার।
-
চৌদ্দগ্রাম: আলকরা।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাতের বেলায় এসব এলাকার নির্জন অংশ ব্যবহার করে দূরপাল্লার যানবাহন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ, ভাঙচুর কিংবা আগুন দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মহাসড়কে নাশকতার সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এসব তথ্য যাচাই করে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং গোপন নজরদারির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি জানান, নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তার ভাষ্য, চিহ্নিত ১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসহ মহাসড়কের পুরো ১০৩ কিলোমিটার এলাকায় দিন-রাত বিশেষ টহল ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। যানবাহন ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা
এদিকে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও রাজনীতির মাঠে দলটির অবস্থান এখন দুর্বল।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। ওই চুক্তিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। সাবেক কূটনীতিকদের একাংশের ধারণা, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে ভারতের আগ্রহ নেই।
প্রত্যর্পণ ছাড়াও দেশে ফেরার আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পাসপোর্ট অথবা ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করা। তবে এ ধরনের আবেদন করা হলে সরকার সেটি অনুমোদন করবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি আইনগত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ভারতের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তার একাধিক বৈঠক হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ধারণা, দেশে ফেরার প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য বিকল্প পরিকল্পনাও তিনি আগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাতও জানিয়েছেন, বিভিন্ন ঝুঁকি ও প্রতিকূলতা থাকলেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন বলে সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।



