ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ‘গভীরভাবে দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
ভিসা না পাওয়ায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে আব্বাসের সরাসরি অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুক্রবার জাতিসংঘের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে মাহমুদ আব্বাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে ভিসা দেওয়া হবে না। ফলে মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের মিশনের সদস্যরাই শুধু সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে জাতিসংঘের কার্যক্রমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের সক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে গুতেরেস উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সব প্রতিনিধিদলের পূর্ণ অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডুজারিক আরও জানান, আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সব প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এ বিষয়ে তিনি মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন।
গত বছরও ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র
গত বছরও ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ভিসা দেয়নি। ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী মাহমুদ আব্বাসকে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের এই ফোরামে বক্তব্য দিতে হয়েছিল।
এ বছরও আব্বাসকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে ১৫২-৩ ভোট পড়ে। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরাষ্ট্র তাঁর ভার্চুয়াল উপস্থিতির পক্ষে ভোট দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) একটি অর্থসহায়তা ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। ওই ব্যবস্থায় কারাগারে থাকা বা নিহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারের সদস্যদের অর্থ দেওয়া হতো। এসব ব্যক্তির মধ্যে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো ব্যক্তিরাও ছিলেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ওই ব্যবস্থা সংস্কার করেছে। নতুন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কেউ কারাগারে ছিলেন কি না—তার পরিবর্তে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি যেসব বিষয়ে
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার ফিলিস্তিনি উদ্যোগেরও বিরোধিতা করে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এ ধরনের উদ্যোগ আলোচনার পরিবর্তে একতরফাভাবে স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে আলোচনাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা।
ওয়াশিংটন আরও অভিযোগ করেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ‘সন্ত্রাসীদের ভাতা দেওয়া’ এবং প্রকাশ্য বক্তব্য ও স্কুলের পাঠ্যবইয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসীদের প্রশংসা করা অব্যাহত রেখেছে। গত বছর জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া ১৪২টি সদস্যরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধ রয়েছে।
পশ্চিম তীরে সহিংসতার মধ্যেই ভিসা প্রত্যাখ্যান
মাহমুদ আব্বাসকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেড়েছে।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল করে রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর ওই অঞ্চলে সহিংসতা আরও বেড়েছে। ওই হামলার পরই গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ শুরু হয়।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির করা হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ওই হামলার পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীদের হাতে কমপক্ষে ১ হাজার ১০৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে যোদ্ধা ও বেসামরিক—উভয়েই রয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরাইলে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এর জবাবে ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৮২১ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও তাদের প্রকাশিত হতাহতের পরিসংখ্যানকে জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের যেকোনো ধরনের সংযুক্তিকরণের (অ্যানেক্সেশন) বিরোধিতা করে তারা।



