বিদ্যুতের বিল নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। জুন মাসে নতুন বিদ্যুৎমূল্য নির্ধারণের পর শহর-গ্রাম নির্বিশেষে প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকে বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন। এর সঙ্গে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত স্ল্যাবে বিদ্যুতের দাম দিতে হয়। নতুন মূল্য অনুযায়ী ৪০০ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা। ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ৫ শতাংশ ভ্যাট। খবর বিবিসি বাংলার।
বিদ্যুৎ বিলের মূল অংশে ব্যবহৃত ইউনিটের হিসাবের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ যুক্ত হয়। মিটার কেনা না থাকলে মিটার ভাড়াও দিতে হয়। আগের মাসের কোনো বকেয়া থাকলে তার সঙ্গে বিলম্ব মাশুলও যোগ হতে পারে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বিলম্ব মাশুল এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়াও যুক্ত হচ্ছে। পোস্টপেইড গ্রাহকের বিলে এসব আলাদাভাবে উল্লেখ থাকে। আর প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময় বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা হয়।
এ কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও শুধু সংযোগ চালু থাকলে প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া দিতে হয় গ্রাহককে।
ডিমান্ড চার্জ কেন নেওয়া হয়?
বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ হলো গ্রাহকের জন্য অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগের সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার বিপরীতে নির্ধারিত একটি চার্জ। আর মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হিসেবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এই চার্জ নির্ধারণ করে। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা।
সে হিসাবে ২ কিলোওয়াট লোডের গ্রাহকের মাসিক ডিমান্ড চার্জ ৮৪ টাকা। ১০ কিলোওয়াট লোডের ক্ষেত্রে দিতে হয় ৪২০ টাকা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লোড অনুমোদন করা হলে পরবর্তী সময়ে সেই বাড়তি লোডের জন্য প্রতি মাসেই ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।
একজন গ্রাহক জানান, কারিগরি বিষয়টি না বোঝার কারণে তিনি ১৫ কিলোওয়াট লোডের সংযোগ নিয়েছেন। এখন শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ প্রতি মাসে ৬৩০ টাকা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে থ্রি-ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা যোগ হলে শুধু এই দুই খাতেই মাসে ৮৮০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
মিটার ভাড়ার হিসাব কী?
বিদ্যুৎ বিল আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব আদায় সহজ করতে দেশে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার আওতায় বিপুলসংখ্যক প্রিপেইড মিটার রয়েছে।
নতুন সংযোগ কিংবা পুরোনো মিটার নষ্ট হলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাবে, একটি সিঙ্গেল-ফেজ প্রিপেইড মিটারের মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা। ১০ বছর বা ১২০ মাসের আয়ুষ্কাল ধরে এ মিটারের ভাড়া মাসে ৪০ টাকা করে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে থ্রি-ফেজ মিটারের মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা এবং এর ভাড়া মাসে ২৫০ টাকা। ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থাই বিনা খরচে নতুন মিটার দেওয়ার কথা।
প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার পর মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং এনার্জি বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন গ্রাহক।
এ কারণে অনেক গ্রাহক টাকা রিচার্জ করার পর প্রত্যাশার চেয়ে কম ব্যালান্স দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বিদ্যুৎ ব্যবহার করার আগেই বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়টিও তাদের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে কেন আন্দোলন?
প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া, বিল বেড়ে যাওয়া এবং নানা ধরনের জটিলতার আশঙ্কায় বিভিন্ন এলাকায় এর বিরোধিতা করছেন গ্রাহকদের একাংশ।
নারায়ণগঞ্জে এ নিয়ে গণ-অনশন, সভা-সমাবেশ হয়েছে। গঠিত হয়েছে নাগরিক অধিকার ফোরাম। প্রিপেইড মিটারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় এই ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, গ্রাহকেরা অগ্রিম টাকা দিতে রাজি নন। তার মতে, প্রিপেইড মিটার চালুর আগে গণশুনানির মাধ্যমে জনগণকে বিষয়টি বোঝানো প্রয়োজন ছিল।
তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রিপেইড মিটার নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে এবং গ্রাহক অধিকার রক্ষায় জাতীয় পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে প্রিপেইড মিটার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
‘ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন যৌক্তিক’
ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া আদায় নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক।
তার মতে, উন্নত প্রযুক্তির মিটার গ্রাহকের জন্য সুবিধা তৈরি করার কথা থাকলেও অনেকের কাছে এটি এখন সেবার পরিবর্তে দুর্ভোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে বিইআরসির বিচারিক পর্যায়ে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
ডিমান্ড চার্জের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিতরণ সংস্থাগুলো যদি গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারে, তাহলে ডিমান্ড চার্জের ভিত্তি ও এর বিপরীতে বিতরণ সংস্থার প্রকৃত ব্যয়ের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিতরণ চার্জের পাশাপাশি আলাদাভাবে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খরচ ও যৌক্তিকতা পরিষ্কার হওয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সমস্যা কোথায়?
বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ডিমান্ড চার্জের মাধ্যমে গ্রাহক মূলত সারা মাস বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য অর্থ দেন। কিন্তু যখন বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হয়, তখন গ্রাহকের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তার মতে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। মানুষের আস্থায় কেন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে তাদের বোঝানো প্রয়োজন।
গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে স্বাধীন কোনো সংস্থার মাধ্যমে হিসাব ও ব্যবস্থাপনা অডিট, যাচাই ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। তবে তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বিতরণ সংস্থার বক্তব্য
বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রায় ৮০ শতাংশকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে।
ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনগণকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইড মিটারে গেলে বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। তার দাবি, প্রিপেইড মিটারে অতিরিক্ত কোনো অর্থ কাটা হয় না; পোস্টপেইডের মতো একই হারে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, গ্রাহক এককালীন মিটারের মূল্য পরিশোধ না করলে ভাড়া নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলে ০.৫ শতাংশ হারে রিবেট বা ছাড় পান।
বিইআরসির অবস্থান
বিদ্যুতের মিটার, ডিমান্ড চার্জ ও অন্যান্য ফি নিয়ে গ্রাহকদের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি।
প্রিপেইড মিটার নিয়েও সরকার গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি বিষয়টি যাচাই করে কোনো সমস্যা পায়নি বলে জানিয়েছে কমিশন। তবে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও প্রিপেইড ব্যবস্থায় অগ্রিম অর্থ কর্তনের বিষয়গুলো নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে চার্জের ভিত্তি, প্রকৃত ব্যয় এবং গ্রাহকের প্রাপ্ত সেবার মধ্যে সম্পর্ক আরও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।



