সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল অনুমোদনের পর এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না এবং এর প্রভাব বেসরকারি খাতে কতটা পড়বে—তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তবে একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নতুন পে স্কেলে সরকার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছে। তবে বেতন বৃদ্ধির কারণে ‘কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আছে’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খাতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার সময়েই সরকার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে। ফলে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁট করার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতও চাপের মুখে পড়তে পারে।
কত টাকা লাগবে, আসবে কোথা থেকে?
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বেতন কমিশনের সুপারিশ ও সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার চেষ্টাও চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে নবম পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
তিনি বলেন, সরকার একসঙ্গে সব টাকা দিতে পারবে না। আগামী দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে দেওয়া হবে। ২০২৮ সাল থেকে ভাতা যোগ হবে। এ ব্যবস্থায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি উপকৃত হবেন।
পে স্কেলের বাড়তি ব্যয় কীভাবে নির্বাহ করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারের বাজেটের মধ্যেই এ ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এমনিতেই কমে আসা এডিপিতে আরও কাটছাঁট হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে প্রভাব
বাংলাদেশে সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। অর্থাৎ একই কাঠামোর আওতায় প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর গত বছরের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। পরে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়।
তখন থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের সংস্থানকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছিলেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ আয় তথা রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতি প্রত্যাশিত নয়।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ওপরের গ্রেডগুলোতে যে হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তবে নিচের গ্রেডের কর্মীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল। এক বছরের মধ্যে পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থের সংস্থানের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি এডিপি কাটছাঁটের কারণে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও সংকুচিত হতে পারে।
তার মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের অতিরিক্ত জনবল ও প্রতিষ্ঠান কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। খালি পদ কমানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পদ ও বিভাগ বিলুপ্ত করা এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ওপর সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায়ও সরকারের প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তার মতে, এর সঙ্গে সরাসরি পে স্কেলের সম্পর্ক নেই। তবে রাজস্ব আহরণ কম হওয়া এবং সরকারি বেতন-ভাতা পরিশোধের প্রয়োজনীয়তার কারণে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কিংবা অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার মতো বিষয়ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
সায়মা হক বিদিশা বলেন, পে স্কেলের কারণে বেসরকারি খাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও সেবা খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। উৎপাদন খরচ কমানো ও ব্যবসা সহজ করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে বেতন বাড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার কথাও বলেন তিনি।
একই সঙ্গে পে স্কেল বাস্তবায়নের সুযোগে যাতে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর অজুহাতে মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করে বেসরকারি খাতকে স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের বেতন-ভাতা সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাব সামাল দেওয়াই এখন বড় বিষয়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এসব ক্ষেত্রেই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



