জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কার্যত জনপ্রতিনিধিশূন্য অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে কবে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে জোর আলোচনা চলছে। সরকারের সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন শুরুর ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সিটি করপোরেশন অথবা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। তবে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আপাতত সরকারের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনায় নেই। সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে শুরু হলে ঢাকার দুই সিটি নাকি ঢাকার বাইরের কোনো সিটিতে আগে ভোট হবে, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। পরবর্তী ধাপে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং সবশেষে জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ—এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন রক্তপাতহীন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে চায়। সরকারও শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইসির আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। তিনি বলেন, “সংসদে পাস হওয়া আইনের আলোকে বিধিমালার যেসব ধারা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।”
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আগে অক্টোবরের কথা শুনেছিলাম, এখন সেপ্টেম্বরের কথাও শুনছি। ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, বর্ষাকাল বিবেচনায় রেখেই নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হবে। বর্ষা শেষে ভোট আয়োজন করতে কমিশনের তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, সরকার যদি এক মাস আগে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়, তাহলে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিটির সদস্য ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় জনগণ চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। তাই দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের জন্য কার্যালয় বরাদ্দ থাকলে নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে পারে। নির্বাচন নিরপেক্ষ রাখতে এ বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন বিধিমালা সংশোধনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালায় নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বাদ দেওয়া, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান বাতিল এবং প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদ বিবরণীর পরিধি বাড়ানোর মতো পরিবর্তন আসতে পারে।
এ ছাড়া প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ ও নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা পুনর্নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে প্রাপ্ত ভোটের ১২ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিধান রয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় এই হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
নির্বাচনী প্রতীক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত প্রতীকগুলোর একটি বড় অংশ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ব্যবহারের চিন্তা করছে কমিশন। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কমিশনে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই নির্বাচন উপযোগী বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সীমানা-সংক্রান্ত কিছু সীমিত জটিলতা থাকলেও তা নির্বাচন আয়োজনে বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনের প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে রয়েছে যে সরকারের নির্দেশনা পেলেই দ্রুত তফসিল ঘোষণা এবং নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবারও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।



