আগামী বছরের শুরুতেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন শুরু করতে চায় কমিশন। রমজান শুরুর আগে তিনটি ধাপে প্রায় ২ হাজার ইউপির নির্বাচন সম্পন্ন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে তিনি বলেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম ধাপের নির্বাচন আয়োজন করা হলে ভোটের ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
ইসি মাছউদ বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বছরের শুরু থেকে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
রমজানের আগে তিন ধাপে ভোট
ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তাঁর মতে, নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তিনি জানান, রমজানের আগে একাধিক ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর রমজান ও এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে আবার নির্বাচন শুরু করে আগামী জুনের মধ্যে সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
রমজানের পর কবে নির্বাচন শুরু হবে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, রমজানের পরপরই এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। তাই সে সময়কার পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী ধাপের নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণ করা হবে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম ধাপের ভোট হলে তফসিলের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, ভোটের অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ইউপির পর পৌরসভা নির্বাচন
ইউপি নির্বাচনের পর পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান এই নির্বাচন কমিশনার।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পরপরই পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের চিন্তাভাবনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আব্দুর রহমানেল মাছউদ। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভালো নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রথম ধাপে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে উল্লেখ করে ইসি মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার বিষয়ে কমিশনকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ধরে নিয়েই কমিশন কাজ শুরু করবে। প্রথম ধাপে ইউপি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা দেখছে না কমিশন। তবে নির্বাচন শুরুর পর পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনও সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজনের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় নির্বাচন দেশব্যাপী এক দিনে অনুষ্ঠিত হলেও ইউপি নির্বাচন হবে এলাকাভিত্তিক, সংখ্যাভিত্তিক এবং বিভিন্ন ধাপে। ফলে অনিয়ম, গণ্ডগোল, মারামারি ও হানাহানি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে কমিশন।
৪ হাজার ২৭২ ইউপিতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন
এদিকে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টিতে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসির সভা শেষে তিনি জানান, আগামী ৬ জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় কমিশন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্যে একটি সময়সূচি ধরে কমিশন কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো শেষ হলে জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে কমিশন আশা করছে। তবে মামলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিষ্পত্তি হলে নির্বাচনের আওতাধীন ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। প্রায় ৫ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ধাপে ধাপে নির্বাচন করতে হলে প্রতিটি ধাপে ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে বলেও জানান তিনি।
নতুন আচরণবিধিতে জামানত ও ব্যয়সীমা নির্ধারণ
এদিকে সম্প্রতি ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২৫ হাজার টাকা এবং সদস্য প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ১০ লাখ টাকা এবং সদস্য প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয় ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের সংখ্যা সমান হলে সর্বোচ্চ সমভোট পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোট গ্রহণের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।



