২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের মস্কো শহরে ঘটে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ড। ইউনিভার্সিটি অব আইডাহোর কাছের একটি ভাড়া বাড়িতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন চার শিক্ষার্থী—ইথান চ্যাপিন, কেলি গনকালভেস, জ্যানা কার্নোডল ও ম্যাডিসন মোগেন।
ঘটনাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ডিএনএ নমুনা, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্রায়ান কোহবার্গারকে গ্রেপ্তার করে।
এই বহুল আলোচিত মামলাকে কেন্দ্র করে নেটফ্লিক্স নির্মাণ করেছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘The Idaho Murders: College Nightmare’, যা ২৯ জুলাই মুক্তি পায়। এতে তদন্তের বিভিন্ন ধাপ, ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং মামলার বিচারপ্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে।
ডিএনএ সূত্রে তদন্তের অগ্রগতি
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল ঘটনাস্থলে উদ্ধার হওয়া একটি ছুরির খাপ। সেখান থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনা তদন্তকারীদের ব্রায়ান কোহবার্গারের কাছে পৌঁছে দেয়।
এ ছাড়া আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে একটি সাদা গাড়ির চলাচল এবং মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালতের রায়
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্রায়ান কোহবার্গার আদালতে চারটি হত্যাকাণ্ডে দোষ স্বীকার করেন। পরে তাঁকে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে মামলার বিচার শেষ হলেও সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটির উত্তর অজানাই থেকে যায়—কেন এই চারজনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং কী ছিল হত্যার উদ্দেশ্য?
তথ্যচিত্রে মস্কো পুলিশের প্রধান অ্যান্থনি ডালিঙ্গার বলেন, তদন্তে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিললেও হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অপরাধবিদ্যার শিক্ষার্থী থেকে হত্যাকাণ্ডের আসামি
ব্রায়ান কোহবার্গার ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ক্রিমিনোলজি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। এর আগে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরও সম্পন্ন করেছিলেন।
তথ্যচিত্রে তাঁর কয়েকজন সাবেক সহপাঠী জানান, তিনি অপরাধ ও সিরিয়াল কিলার নিয়ে আলোচনায় বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এছাড়া গবেষণার অংশ হিসেবে রেডিটে অপরাধীদের মানসিকতা নিয়ে একটি প্রশ্নাবলি প্রকাশ করেছিলেন।
তবে তথ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারীদের কিছু মূল্যায়ন ও ধারণা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। আদালত হত্যার উদ্দেশ্য বা তাঁর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
পরিবারের শোক এখনো কাটেনি
দোষ স্বীকার ও সাজা ঘোষণার মাধ্যমে মামলার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেও নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের শোক শেষ হয়নি।
কিছু পরিবারের সদস্য মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ বিচার হলে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যেতে পারত। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া তাঁদের মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিত।
কারাগার থেকে নতুন দাবি
২০২৬ সালে কারাগার থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রায়ান কোহবার্গার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং দোষ স্বীকারের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগ তোলেন। তিনি নিজের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলও করেছেন।
তবে বর্তমানে আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রয়েছে।
উত্তরহীন এক প্রশ্ন
‘The Idaho Murders: College Nightmare’ শুধু একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পুনর্গঠন নয়; এটি তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া, ভুক্তভোগী পরিবারের শোক এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের জটিল দিকগুলোও তুলে ধরে।
তথ্যচিত্রের শেষে খুনির পরিচয় ও বিচার জানা থাকলেও একটি প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত থেকে যায়—কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল? সেই উত্তরহীন প্রশ্নই পুরো ঘটনাকে আজও রহস্যময় ও আলোচনার কেন্দ্রে রেখে দিয়েছে।



