tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদসারাদেশগ্যাস নেই, তবু বিল দিতে হচ্ছে—ডাবল খরচে দিশেহারা ফেনীর গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানা

গ্যাস নেই, তবু বিল দিতে হচ্ছে—ডাবল খরচে দিশেহারা ফেনীর গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানা

ফেনী শহর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রায় ৩২ হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে দিনের বেশিরভাগ সময়ই গ্যাস মিলছে না। ফলে একদিকে নিয়মিত পাইপলাইনের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করায় গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ব্যয়।

শুধু গৃহস্থালিই নয়, গ্যাসের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, দ্রুত সমাধান না এলে কারখানা বন্ধ করে আন্দোলনে নামা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।

ভোরে সামান্য গ্যাস, দিনের বাকি সময় শূন্য

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শহরের রামপুর, পূর্ব উকিলপাড়া, পেট্রোবাংলা, বাঁশপাড়া, আলোকদিয়াসহ প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সামান্য গ্যাস পাওয়া গেলেও সকাল ৭টার পর চাপ একেবারে শূন্যে নেমে আসে। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বলে না।

ফলে অনেক পরিবার এখন তিন ধরনের রান্নার ব্যবস্থা রাখতে বাধ্য হয়েছে—লাইন গ্যাস, এলপিজি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলা। এতে মাসিক ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

পূর্ব উকিলপাড়ার বাসিন্দা ফাহিমা আবেদীন বলেন, “বাসায় তিন ধরনের রান্নার ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে। গ্যাসের বিলও দিচ্ছি, আবার সিলিন্ডার ও বিদ্যুতের খরচও বহন করতে হচ্ছে। এভাবে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

শহরতলীর আলোকদিয়ার বাসিন্দা কাজী রিয়াজ বলেন, “গ্যাস আসে গভীর রাতে, আবার ভোরেই চলে যায়। আমরা কি রাত জেগে রান্না করব?”

গ্যাস সংকটের কারণে অনেক পরিবার এখন সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবারের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে যেমন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উৎপাদন ব্যাহত, কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ফেনী বিসিক শিল্পনগরীসহ স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলোতে। প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতিদিন বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ।

ফেনী বিসিক শিল্পনগরীর কারখানা মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। স্বয়ংক্রিয় মেশিন চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও হঠাৎ চাপ কমে যাওয়ায় চলমান উৎপাদন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়।”

বিস্কুট ও বেকারি শিল্পের উদ্যোক্তা আবদুল মোতালেব বলেন, ওভেনে পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ না থাকলে পণ্যের মান ঠিক থাকে না। অনেক সময় পুরো উৎপাদিত ব্যাচই নষ্ট হয়ে যায়।

তার ভাষায়, “গত তিন মাস ধরে দিনে উৎপাদনই করতে পারছি না। গভীর রাতে সীমিত সক্ষমতায় কাজ করতে হচ্ছে। শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমরা দেউলিয়া হওয়ার পথে।”

বিল নিয়ে ক্ষোভ, আন্দোলনের প্রস্তুতি

পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার এলাকার ভবনমালিক নিজাম উদ্দিন জানান, গ্যাস না পাওয়ায় তার ভবনের ভাড়াটিয়ারা এখন আর গ্যাস বিল দিতে রাজি নন। একাধিকবার বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনো সমাধান পাননি।

দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের একটি অংশ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

কী বলছে বাখরাবাদ গ্যাস?

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ফেনী কার্যালয় জানায়, জেলার পুরোনো সঞ্চালন পাইপলাইনের পরিবহন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাখরাবাদ গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, মূলত সঞ্চালন লাইনের জটিলতার কারণেই কাঙ্ক্ষিত গ্যাসচাপ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নতুন লাইন নির্মাণ বা বিকল্প ব্যবস্থার পরিকল্পনা থাকলেও কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।

এদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় না থেকে অন্তত অন্তর্বর্তীকালীন কোনো ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করা হোক। তাদের ভাষায়, গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে পাইপলাইনের বিল দেওয়া এবং একই সঙ্গে এলপিজি ও বিদ্যুতের খরচ বহন করা আর সম্ভব নয়।