পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও আধুনিক নগরী গড়ার লক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এখন থেকে যত্রতত্র ময়লা ফেলার পরিবর্তে ‘উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ’ (সোর্স সেগ্রিগেশন) কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। বর্জ্যকে শুধুমাত্র আবর্জনা নয়, বরং সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এই আধুনিক কার্যক্রম।
মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানীর গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বর্জ্য পৃথকীকরণ বিন ও পলিব্যাগ বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এমন এক আধুনিক পর্যায়ে নিতে চাই, যেখানে রাস্তাঘাটে কোনো ময়লা থাকবে না। নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে বর্জ্য জমা হবে এবং সেখান থেকে সিটি করপোরেশন তা দ্রুত অপসারণ করবে।”
তিনি আরও বলেন, সচেতনতার অভাবে এখনো অনেকে উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলছেন। এ পরিস্থিতি বদলাতে পর্যায়ক্রমে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ডাস্টবিন স্থাপন করা হবে। গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদ থেকেই এ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর ১০টি জোনের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
কোন বিনে কোন বর্জ্য
প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ৫০০টি বিন বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৫০টি সবুজ এবং ২৫০টি হলুদ রঙের বিন।
- সবুজ বিন : রান্নাঘরের উচ্ছিষ্টসহ পচনশীল বর্জ্যের জন্য
- হলুদ বিন : প্লাস্টিক, কাঁচ, ধাতব পদার্থসহ অপচনশীল বর্জ্যের জন্য
অনুষ্ঠানে গুলশান সোসাইটির পাশাপাশি ডি’মাজেনত গির্জা, সেন্ট ইউজিনস স্কুল, এমডিসি মডেল স্কুল এবং মিরপুর কলেজ-সংলগ্ন কেন্দ্রীয় মন্দিরেও এসব বিন বিতরণ করা হয়। এ সময় প্রশাসক নগরবাসীকে সঠিক বিন ব্যবহারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
বর্জ্য থেকেই আয় সম্ভব
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “বর্জ্য এখন আর ফেলে দেওয়ার জিনিস নয়; এটি একটি মূল্যবান সম্পদ। বিশ্বের অনেক দেশ বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করেছে, গুলশানেও আমরা সেই ধারা অনুসরণ করতে চাই।”
তিনি জানান, গুলশানের প্রায় ১২ হাজার পরিবারের প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টে আলাদা ডাস্টবিন বা ভিন্ন রঙের পলিব্যাগ সরবরাহ করা হবে, যাতে বাসিন্দারা ঘর থেকেই বর্জ্য আলাদা করতে পারেন। ইতোমধ্যে মসজিদের পাশে পাঁচটি ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পার্কগুলোতেও এ ব্যবস্থা চালু করা হবে। নিয়ম না মানলে জরিমানার ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানান তিনি।
কোরবানির বর্জ্য ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি
আসন্ন ঈদুল আজহা এবং ডেঙ্গু মৌসুমকে সামনে রেখে বিশেষ প্রস্তুতির কথাও জানান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, “কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”
জনসচেতনতা বাড়াতে ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাউল সংগীতের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা ঈদ পর্যন্ত চলবে। পাশাপাশি ময়লাবাহী গাড়িতেও যুক্ত করা হয়েছে সচেতনতামূলক বার্তা। এ কার্যক্রমে বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটি, বাড়ির মালিক সমিতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
অনুষ্ঠানে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর হুমায়ুন কবির বলেন, “পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বর্জ্য উৎপাদনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। উৎসেই বর্জ্য পৃথক করা গেলে রিসাইক্লিং ও অপসারণ অনেক সহজ হবে।”
নগরবাসীর উদ্দেশে প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “ভালো কাজের জন্য আমাদের উৎসাহ দিন, আর ভুল হলে গঠনমূলক সমালোচনা করুন। পাশাপাশি সমাধানের পরামর্শও দিন, যাতে ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা যায়।”
অনুষ্ঠান শেষে গুলশান সোসাইটি কর্তৃপক্ষের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য পৃথকীকরণ বিন ও ব্যাগ হস্তান্তর করা হয়।



