মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বাহিনী গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
এই হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানে, পাশাপাশি তেল আবিবেও হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারণা ছিল, ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করলে তেহরানে সরকার পরিবর্তন সহজ হবে।
তবে সেই হিসাব পুরোপুরি ভেস্তে দিয়ে ইরান দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশগুলোতেও হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে তারা। একই সঙ্গে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
প্রায় ৪০ দিন সংঘাত চলার পর গত ৮ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে এ ঘোষণায় আস্থা রাখেনি ইরান।
তেহরানের দাবি, যুদ্ধবিরতির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানও পুনরায় সংঘাতের জন্য প্রস্তুত বলে কঠোর বার্তা দিয়েছে।
ইরানের অভিযোগ, তাদের নৌবন্দরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল এবং এটি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এই অবরোধ অব্যাহত থাকবে। এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে ইরান।
এদিকে পাকিস্তান দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় আগ্রহ দেখালেও ইরান এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। তাদের বক্তব্য, মার্কিন শর্ত ও নৌ অবরোধ বহাল থাকলে তারা ইসলামাবাদে কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না।
অন্যদিকে, শান্তি আলোচনার কথা বললেও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ অঞ্চলটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তি আরও বাড়বে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা সম্ভব হবে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।
ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, তারা জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কোনো পক্ষই আপসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, অর্থনৈতিক চাপ ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করা যাবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়লেও ইরান সহজে নতি স্বীকার করবে না।
ইরানি নেতৃত্বের বিশ্বাস, তারা চাপ সহ্য করতে সক্ষম এবং নিজেদের শর্ত পূরণ হলেই কেবল কোনো চুক্তিতে আগ্রহ দেখাবে।



