tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকবিশ্বমঞ্চে চীনা নববর্ষ: প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও কূটনীতির মহামিলন

বিশ্বমঞ্চে চীনা নববর্ষ: প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও কূটনীতির মহামিলন

ফেব্রুয়ারি ১৬, বেইজিং সময় রাত ৮টা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের চোখ তখন চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক আয়োজন—China Media Group (সিএমজি) আয়োজিত ২০২৬ সালের চীনা বসন্ত উৎসব গালার দিকে। ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি ও রুশসহ ৮৫টি ভাষায়, বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ৩,৩০০টির বেশি গণমাধ্যমের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচার করা হয়—যা একে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঘটনার মর্যাদা দিয়েছে।

এ বছর চীনা চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী ‘অশ্ব বর্ষ’। চীনা সংস্কৃতিতে ঘোড়া আত্মউন্নয়ন, অধ্যবসায় ও অগ্রগতির প্রতীক। সেই ভাবনাকে ধারণ করে এবারের গালার প্রতিপাদ্য—‘সুদক্ষ ঘোড়া ছুটে আসছে, তার গতি অপ্রতিরোধ্য’—যা মানুষকে স্বপ্নপূরণের পথে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার অনুপ্রেরণা দেয়।

১৯৮৩ সাল থেকে সম্প্রচারিত এই গালা এখন বিশ্বজুড়ে চীনা পরিবারগুলোর পুনর্মিলনী উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে প্রায় ২০টি দেশ ও অঞ্চলে বসন্ত উৎসব সরকারি ছুটি হিসেবে স্বীকৃত; বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ বিভিন্নভাবে এ উৎসব উদযাপন করে।


প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ

এবারের গালার অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এআইজিসি প্রযুক্তির ব্যবহার। হাজার হাজার ঘোড়ার সম্মিলিত দৌড়ের দৃশ্য ডিজিটাল প্রক্ষেপণের মাধ্যমে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলা হয়। ‘রেশম পথ’ প্রেরণায় নির্মিত নৃত্য পরিবেশনায় প্রাচীন দেয়ালচিত্রের ঘোড়াকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় যেন বাস্তব জগতে নিয়ে আসা হয়েছে।

অ্যাক্রোব্যাটিক পরিবেশনাতেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভিনব প্রয়োগ দর্শকদের মুগ্ধ করে। ঐতিহ্যবাহী কসরতের সঙ্গে আধুনিক ভিজ্যুয়াল ডিজাইনের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় নতুন নান্দনিক অভিজ্ঞতা।

প্রায় তিন দশক ধরে গালার সমাপনী সংগীত হিসেবে পরিবেশিত ‘অবিস্মরণীয় আজকের রাত’ গানটিও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।


রোবটের যুগে সাংস্কৃতিক মঞ্চ

২০২৬ সালের গালা কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের এক প্রদর্শনীও। সিএমজি স্টুডিওতে চার ধরনের হিউম্যানয়েড রোবট কাজ করেছে—কেউ মঞ্চে পারফর্ম করেছে, কেউ নেপথ্যে সহায়তা দিয়েছে।

গ্যালাক্সি জেনারেল, সংইয়ান ডাইনামিক্স, ইউশু টেকনোলজি ও ম্যাজিক অ্যাটমের রোবট একসঙ্গে অংশ নেয়। ২০২৫ সালে প্রথমবার রোবট পারফরম্যান্স শুরু হলেও এবারের আয়োজন চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রদর্শনী নয়; জাতীয় পর্যায়ের রোবট উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের বাস্তব প্রতিফলন। গালার মঞ্চ যেন ভবিষ্যৎ শিল্পখাতের সম্ভাবনার এক ঝলক দেখিয়েছে।


বরফের শহর হারবিনে শাখা ভেন্যু

চীনের উত্তরাঞ্চলের শহর Harbin এবারের গালার অন্যতম আকর্ষণীয় শাখা ভেন্যু। ‘বরফ শহর’ হিসেবে পরিচিত এ নগরীতে বরফ ও তুষার দিয়ে নির্মিত মঞ্চে আয়োজন করা হয় বিশেষ পরিবেশনা।

বিশ্বখ্যাত Harbin Ice and Snow World-এ নির্মিত মঞ্চে বিশাল ডিজিটাল পর্দা না থাকলেও বরফের স্বচ্ছতা ও আলোর খেলা দর্শকদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় শহরের আন্তরিকতা ও উৎসবমুখর আবহ ফুটে ওঠে।


দুবাইয়ের আকাশে চীনা উৎসবের আলো

চীনা বসন্ত উৎসবের বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতীক হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের Burj Khalifa ভবনে বিশেষ আলোক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। টানা সপ্তমবারের মতো আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে গালার মাসকট, প্রাচীন চীনা অক্ষরে ‘ঘোড়া’ এবং দ্রুতগামী অশ্বের প্রতিচ্ছবি ভবনের গায়ে ভেসে ওঠে।

ঘোড়া চীন ও আরব—উভয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হওয়ায় এই আয়োজন দুই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও দৃঢ় করেছে। অসংখ্য পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ এ দৃশ্য উপভোগ করেন।


আন্তর্জাতিক শুভেচ্ছা ও কূটনৈতিক বার্তা

চীনা নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের নেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping-কে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin রাশিয়া-চীন কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট Luiz Inácio Lula da Silva সহযোগিতা সম্প্রসারণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী Shehbaz Sharif চীনের আধুনিকায়ন প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের নেতাদের পাশাপাশি Food and Agriculture Organization এবং Shanghai Cooperation Organisation-এর শীর্ষ কর্মকর্তারাও চীনের উন্নয়ন ও জনগণের সমৃদ্ধি কামনা করেছেন।


বিশ্বায়নের প্রতীক

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের চীনা বসন্ত উৎসব গালা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ঐতিহ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক বন্ধনের এক অনন্য সম্মিলন।

বেইজিংয়ের মঞ্চ থেকে হারবিনের বরফ নগরী, আবার দুবাইয়ের আকাশচুম্বী স্থাপনা পর্যন্ত—চীনা নববর্ষ এখন সত্যিকারের বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আয়োজন দেখিয়ে দিয়েছে—ঐতিহ্য যখন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সংস্কৃতি যখন বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে যায়, তখন একটি উৎসব কেবল একটি দেশের নয়; তা হয়ে ওঠে সমগ্র মানবসমাজের সম্পদ।

সূত্র: সিএমজি