বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আজীবন সংগ্রামী এক নেত্রী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপসহীন। সামরিক ও বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে তার অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন একটি রাজনৈতিক আদর্শ। দেশপ্রেমকে তিনি আজীবন লালন করেছেন।
খালেদা জিয়া বলতেন, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু প্রভু নেই—দেশই আমার আসল ঠিকানা।’ এই দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধের কারণেই তার শেষযাত্রায় মানুষের ভালোবাসা ছিল অভূতপূর্ব, যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কঠিন সময়েও তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, রুচিশীল ও পরমতসহিষ্ণু।
জাতির এই সন্ধিক্ষণে যখন তার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তবে তার আদর্শ অম্লান। এ দেশের মানুষ তাকে অনন্তকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে। কারণ বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শকে ধারণ করতে হবে। তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় দেশের বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন।
এ সময় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সম্পাদক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
শোকসভায় অংশ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের নাম। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, ধৈর্যশীল ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তিনিও তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার দাবি জানান।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতির এই সংকটকালে তার অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। তিনি চাইতেন আমরা সবাই নীতিনিষ্ঠভাবে, দেশপ্রেম থেকে একত্রে জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করি।
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর ও নিঃস্বার্থ। তার মৃত্যুতে সময় থেমে যায়নি; বরং তার আদর্শই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথনির্দেশক হবে।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে”—এই বিশ্বাস থেকেই তার রাজনীতিকে বুঝতে হবে। তার সত্যনিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও সহনশীলতা আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, একটি অবাধ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি তার শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা তাকে ব্যতিক্রমী নেতৃত্বে উন্নীত করেছে।
নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না—তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষের ও দেশের নেত্রী।
অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানান তার চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। শোকগাথা পাঠ করেন সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন। দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়।



