tanaka
প্রচ্ছদরাজনীতিপোশাকশিল্পের সংকট কাটাতে জামায়াতের ১৫ দফা দাবি

পোশাকশিল্পের সংকট কাটাতে জামায়াতের ১৫ দফা দাবি

শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট সমাধানে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি পেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং কারখানা বন্ধের ফলে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু শ্রমিক-মালিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের উৎপাদন, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়।

তিনি জানান, গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত ২১ বছর বয়সী শ্রমিক তৌফিক শেখ রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জামায়াত। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানায় দলটি।

পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, খাদ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের খরচ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের উন্নতি হয়নি। ফলে নিজেদের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁর অধিকার। শ্রমিকদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে পোশাকশিল্প ও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে। তাই তাঁদের জীবনমান উপেক্ষা করে এ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড নিরপেক্ষ সুপারিশ দেবে বলে আশা করে জামায়াত। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানালেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন ব্যাহত করার কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ে।

চলমান অসন্তোষের পেছনে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী করা যাবে না। প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার বন্ধের দাবি জানান তিনি।

গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর বক্তব্য, কী কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, কারা দায়ী এবং কোন পরিস্থিতিতে ঘটনাটি ঘটেছে—তা তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দায়ীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহত ও আহতদের পরিবারের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, এ খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও অসংখ্য পরিবারের জীবন-জীবিকা জড়িত। বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলমান পরিস্থিতিতে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।

এ ছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্ধৃত তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকট সমাধানে শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর ওপর জোর দেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবনমান ও কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি বাড়বে, যা উৎপাদনশীলতা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি কারখানার নিরাপত্তা, বিনিয়োগের সুরক্ষা, উন্নত উৎপাদন পরিবেশ এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রেশনিং, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সরকারের কাছে জামায়াতের ১৫ দফা দাবি

১. শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হবে।

২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অযাচিত বলপ্রয়োগ, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।

৫. শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৮. পোশাকশিল্পের সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে দ্রুত কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।

৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার চেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করতে হবে।

১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে।

১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয় পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।

১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইমসহ সব আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

১৩. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।

১৪. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।