ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল উপলক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফয়সাল করিমের দুটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে হত্যার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, হাদিকে গুলি করে হত্যার পর ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে যান।
ফয়সালের ভিডিওগুলো আসল নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি—তা নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে তিনি আদৌ দুবাইয়ে আছেন কি না, সে প্রশ্নও উঠে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, “ভিডিও বার্তাটি সঠিক, তবে তার অবস্থান দুবাই নয়। তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, সে বর্তমানে ভারতে রয়েছে।”
হাদি হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিরা হলেন—হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ, পলায়নে সহায়তাকারী মানবপাচারকারী ফিলিফ স্নাল, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী এবং ফয়সালের বোন জেসমিন।
ডিবিপ্রধান আরও বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, হাদি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী পল্লবীর সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। ভবিষ্যতে তদন্তে নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শরীফ ওসমান হাদি একজন পরিচিত মুখ ছিলেন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সমালোচনামূলক ও জোরালো বক্তব্য দিতেন। এতে ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
তদন্তে জানা গেছে, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর ফয়সাল ও আলমগীরের পলায়নে সহায়তাকারী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং হাদির পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে—রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের সময় বিজয়নগর এলাকায় তিনি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ী তাকে গুলি করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং অস্ত্রোপচারের পর রাতে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করে পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরবর্তীতে হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।



