tanaka
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনস্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের ৫ শিক্ষা

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের ৫ শিক্ষা

স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের ৫ শিক্ষা

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি ভালোবাসা, সম্মান, আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। ইসলাম যেমন দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি তার সঙ্গে সদাচরণ, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনেরও শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।’
—সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯

স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ

‘তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের পোশাকস্বরূপ।’
—সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭

দাম্পত্য জীবনে উত্তম আচরণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’
—তিরমিজি, ৩৮৯৫

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবনেও স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, কৃতজ্ঞতা এবং তাদের গুণের স্বীকৃতির বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাঁর জীবনের এমন পাঁচটি ঘটনা দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

১. খাদিজা (রা.)-এর স্মরণ ও প্রশংসা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও তিনি তাকে গভীরভাবে স্মরণ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে খাদিজা (রা.)-এর প্রতি যতটা ঈর্ষা অনুভব করেছি, অন্য কারও প্রতি ততটা করিনি। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে প্রায়ই স্মরণ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন।’
—বুখারি, ৫২২৯

একই বর্ণনায় খাদিজা (রা.)-এর জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদের সুসংবাদের কথাও এসেছে। এতে বোঝা যায়, প্রিয় স্ত্রীর গুণ, অবদান ও মর্যাদা প্রকাশ করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে কোনো সংকোচ ছিল না।

২. খাদিজা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা স্বীকার

রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত খাদিজা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে এসেছে—

خَيْرُ نِسَائِهَا مَرْيَمُ ابْتُنُ عِمْرَانَ وَخَيْرُ نِسَائِهَا خَدِيجَةُ

‘পৃথিবীতে স্ত্রীদের মধ্যে (সে যুগে) শ্রেষ্ঠ ছিলেন মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং (এ যুগে) শ্রেষ্ঠ হলেন খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ।’
—মুসলিম, ২৪৩০

ইসলামের সূচনালগ্নে খাদিজা (রা.)-এর ঈমান, ত্যাগ, সাহস ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সহযোগিতার যে ভূমিকা ছিল, তাঁর বক্তব্যে তার মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পাওয়া যায়।

৩. আয়েশা (রা.)-কে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হিসেবে উল্লেখ

একবার হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?’

তিনি বলেন, ‘আয়েশা।’

এরপর জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘পুরুষদের মধ্যে?’

তিনি বলেন, ‘তার বাবা।’

—তিরমিজি, ৩৮৮৬

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। দাম্পত্য সম্পর্কে ভালোবাসা প্রকাশ ও প্রিয়জনকে নিজের অনুভূতির কথা জানানো যে স্বাভাবিক ও সুন্দর আচরণ—এ ঘটনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

৪. আয়েশা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা

হজরত আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ، وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ، وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ، وَفَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ

‘পুরুষদের মধ্যে অনেকে পূর্ণতা অর্জন করেছেন। নারীদের মধ্যে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম পূর্ণতা অর্জন করেছেন। আর নারীদের ওপর আয়েশার মর্যাদা এমন, যেমন অন্যান্য খাবারের ওপর সারিদের মর্যাদা।’
—বুখারি, ৩৪১১

এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। স্ত্রীর জ্ঞান, গুণ ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

৫. দানশীলতার প্রশংসা ও মর্যাদা প্রকাশ

একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার হাত সবচেয়ে লম্বা, সে আমার সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত মিলিত হবে।’

এরপর স্ত্রীদের মধ্যে হাত মাপা হলে সাওদা (রা.)-এর হাত সবচেয়ে লম্বা পাওয়া যায়। পরে বোঝা যায়, ‘লম্বা হাত’ বলতে শারীরিক দৈর্ঘ্য নয়, বরং বেশি দানশীলতাকে বোঝানো হয়েছিল। সাওদা (রা.) দান-সদকা করতে ভালোবাসতেন। পরবর্তী সময়ে তিনিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে সবার আগে ইন্তেকাল করেন।
—বুখারি, ১৪২০

দাম্পত্য জীবনের জন্য যে শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবনের এসব ঘটনা থেকে দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা পাওয়া যায়। স্ত্রীকে ভালোবাসা, তার গুণের প্রশংসা করা, অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার মর্যাদা প্রকাশ করা সুন্দর দাম্পত্য আচরণের অংশ।

খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। আয়েশা (রা.)-এর প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। আবার স্ত্রীদের গুণ ও দানশীলতারও প্রশংসা করেছেন।

দাম্পত্য জীবনে ছোট ছোট ভালো আচরণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, পরস্পরের গুণের প্রশংসা এবং সম্মান প্রদর্শন সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও মধুর করে তুলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবন থেকে তাই ভালোবাসার পাশাপাশি একে অপরের মর্যাদা রক্ষা ও গুণের স্বীকৃতি দেওয়ার শিক্ষাও গ্রহণ করা যায়।