কখনো কি নিজের কোনো গুনাহের কথা মনে করে আপনার হৃদয় ভারী হয়ে উঠেছে? মনে হয়েছে, এত ভুল করার পরও কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন? বারবার একই গুনাহে জড়িয়ে পড়ার কারণে নিজের ওপরই কি ঘৃণা জন্মেছে? এমনও কি মনে হয়েছে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকারটুকুও বুঝি আর অবশিষ্ট নেই?
যদি এমন অনুভূতি আপনার মনে এসে থাকে, তাহলে জেনে রাখুন—আপনার জন্য রয়েছে আশার এক মহান বার্তা। মানুষ যতবারই ভুল করুক, আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ কখনো বন্ধ হয়ে যায় না। আমাদের রব পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। তিনি চান, তাঁর বান্দা গুনাহের অন্ধকারে ডুবে না থেকে অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁর রহমতের ছায়ায় ফিরে আসুক।
আল্লাহর ক্ষমার দরজা এখনো খোলা
গুনাহে জর্জরিত বান্দার জন্য মহান আল্লাহর ঘোষণা কতই না আশাব্যঞ্জক! তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর রবের পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي
‘হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’
একজন বান্দা গুনাহ করার পর এভাবে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ، قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي
‘আমার বান্দা একটি গুনাহ করেছে। সে জানে, তার একজন রব আছেন, যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের কারণে শাস্তিও দেন। আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম।’
এরপর বান্দা আবার গুনাহ করে এবং আবারও ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করেন। এভাবে বান্দা যখনই গুনাহের পর আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৫৮)
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নিরাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)
আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَىٰ مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي
‘হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে ক্ষমার আশা রাখবে, তোমার যত গুনাহই থাকুক না কেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৪০)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
‘তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত ২০)
শুধু তা-ই নয়, যারা আন্তরিকভাবে তওবা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২২২)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ
‘আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ ক্ষমা করতে পারে?’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫)
অর্থাৎ, গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। তাঁর কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসতে হবে।
গুনাহগারদের মধ্যে উত্তম কারা?
মানুষ মাত্রই ভুল করে। তবে ভুলের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম হলো যারা বেশি বেশি তওবা করে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ২৪৯৯)
বান্দার তওবায় আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত আনন্দিত হন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ
‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪৭)
তাই গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার ও তওবা করতেন। তিনি বলেন—
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
‘আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তওবা করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩০৭)
সুবহানাল্লাহ! আমাদের রবের দয়া ও ক্ষমা কতই না অসীম!
আন্তরিক তওবার জন্য যা করতে হবে
কুরআন-হাদিসে আল্লাহর ক্ষমার যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে থাকবে আর শুধু মুখে ক্ষমা চাইবে। বরং এর শিক্ষা হলো, গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
তওবার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া: যে গুনাহের জন্য তওবা করা হচ্ছে, তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- অনুতপ্ত হওয়া: নিজের ভুলের জন্য অন্তর থেকে অনুশোচনা করতে হবে।
- দৃঢ় সংকল্প করা: ভবিষ্যতে ওই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার আন্তরিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
- অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া: কারও সম্পদ, সম্মান বা অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে কিংবা তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
- আবার ভুল হলে ফিরে আসা: দুর্বলতার কারণে একই গুনাহে আবার জড়িয়ে পড়লেও তওবা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নতুন করে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
অতীত যত অন্ধকারই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়
হয়তো আপনি জীবনে অনেক ভুল করেছেন। হয়তো অতীতের কিছু ঘটনা মনে পড়লে আজও আপনার চোখ ভিজে ওঠে। এমন কিছু গুনাহও থাকতে পারে, যেগুলোর কথা মনে হলে নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হয়।
কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার অতীত যত অন্ধকারই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অনেক বড়। শয়তান আপনাকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক যে আপনার আর ক্ষমা নেই, তার প্ররোচনায় হতাশ হবেন না।
আপনার রবের কাছে ফিরে আসুন। অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা চান। সিজদায় নিজের ভুল স্বীকার করুন। কারণ গুনাহের পর আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং তাঁর কাছেই ফিরে আসাই একজন মুমিনের পথ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তওবা করার তাওফিক দান করুন। আমাদের জানা-অজানা সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।



