পৃথিবীর সব কষ্ট কি চোখে দেখা যায়? সব কান্নাই কি চোখের জলে প্রকাশ পায়? কিছু মানুষ হাসিমুখে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন, অথচ বুকের ভেতর বয়ে বেড়ান অসংখ্য না বলা কষ্ট, অজানা দুশ্চিন্তা আর নীরব যন্ত্রণা। হয়তো কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলার সাহস পান না। শুধু আল্লাহর কাছে হাত তুলে প্রকাশ করেন মনের অসহায়ত্ব।
তাই কেউ যখন আপনার কাছে বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন’—তখন তাঁর কথাটিকে সাধারণ অনুরোধ ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। বরং আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁকে নিজের দোয়ায় স্মরণ রাখুন।
কেউ আপনার কাছে দোয়া চাইলে যথাসম্ভব তাঁর জন্য সত্যিই দোয়া করুন। কারণ আপনি জানেন না, এই মুহূর্তে তাঁর হৃদয়ে কতটা দুশ্চিন্তা, কতটা কষ্ট কিংবা কত না বলা যন্ত্রণা জমে আছে!
হয়তো দিনের পর দিন তিনি এমন কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করছেন, যার কথা কাউকে খুলে বলতেও পারছেন না। হয়তো তাঁর জীবনে এমন কিছু সমস্যা রয়েছে, যার সমাধান নিজের সাধ্যের বাইরে। একটুখানি স্বস্তি, প্রশান্তি ও আল্লাহর বিশেষ রহমতের আশায় হয়তো তিনি আপনার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
তাই তাঁর জন্য এ দোয়াটি করতে পারেন—
اللَّهُمَّ أَكْثِرْ مَالَهُ وَوَلَدَهُ، وَأَطِلْ عُمُرَهُ، وَاغْفِرْ لَهُ، وَبَارِكْ لَهُ فِيمَا رَزَقْتَهُ.
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকছির মালাহু ওয়া ওয়ালাদাহু, ওয়া আত্বিল উমরাহু, ওয়াগফির লাহু, ওয়া বারিক লাহু ফিমা রাযাকতাহু।
অর্থ: হে আল্লাহ! তার সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করে দিন, তার আয়ু দীর্ঘ করুন, তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে যে রিজিক দিয়েছেন, তাতে বরকত দান করুন।
মনে রাখতে হবে, একজন মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের অনুপস্থিতিতে আন্তরিকভাবে দোয়া করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ
অর্থ: ‘আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা ইমানের সঙ্গে আমাদের আগে অতিক্রান্ত হয়েছে।’ (সুরা আল-হাশর, আয়াত ১০)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, নিজের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি অন্য মুমিন ভাই-বোনদের জন্যও ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করা মুমিনের সুন্দর বৈশিষ্ট্য।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
دَعْوَةُ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ مُسْتَجَابَةٌ
অর্থ: ‘একজন মুসলিম ব্যক্তি তার অনুপস্থিতিতে তার ভাইয়ের জন্য যে দোয়া করে, তা কবুল করা হয়।’
এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, ফেরেশতা বলেন, ‘আমিন! তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৩২)
একবার ভেবে দেখুন, আপনি যখন অন্য কারও জন্য নিভৃতে কল্যাণের দোয়া করছেন, তখন একজন ফেরেশতা আপনার নিজের জন্যও অনুরূপ কল্যাণের দোয়া করছেন! তাহলে কেন আমরা এই মহৎ সুযোগ হাতছাড়া করব?
হয়তো আপনার করা একটি আন্তরিক দোয়ার উসিলায় আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দেবেন। দূর করে দেবেন দুশ্চিন্তা, বিপদ থেকে দেবেন মুক্তি কিংবা তাঁর হৃদয়ে দান করবেন প্রশান্তি।
আমরা জানি না, কার কোন দোয়া কখন কার জীবনে রহমত হয়ে আসে। তবে বিশ্বাস রাখতে পারি, আল্লাহর কাছে করা আন্তরিক প্রার্থনা কখনোই অর্থহীন নয়।
তাই কেউ যদি কখনো আপনার কাছে এসে বলেন, ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন’—তাহলে শুধু মুখে আশ্বাস দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন না। বরং সুযোগ পেলেই তাঁর জন্য দোয়া করুন। তাঁর নাম মনে থাকলে নাম ধরে দোয়া করুন। তাঁর কষ্টের কথা জানা থাকলে সেই কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। আর কিছুই জানা না থাকলে অন্তত এভাবে দোয়া করতে পারেন—
‘হে আল্লাহ! তাঁর সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিন, তাঁর কষ্টগুলো সহজ করে দিন, তাঁর মনের নেক ইচ্ছাগুলো পূরণ করুন এবং তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন।’
মনে রাখবেন, আপনার একটি আন্তরিক দোয়াই হয়তো কারও জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তাই কেউ দোয়া চাইলে তাঁকে অবহেলা করবেন না। নিজের দোয়ায় তাঁকে স্মরণ রাখুন।
ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে একে অপরের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করার সুন্দর মানসিকতা দান করুন। আমিন।



