tanaka

ভরিতে সোনার দাম বাড়লো ২১৫৮ টাকা

দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে...
প্রচ্ছদজাতীয়সিন্ডিকেট ভাঙতে এলপিজির বাজারে নামছে বিপিসি, বাড়ছে সরকারি বিনিয়োগ

সিন্ডিকেট ভাঙতে এলপিজির বাজারে নামছে বিপিসি, বাড়ছে সরকারি বিনিয়োগ

দেশে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হতে পারে। এমনকি অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এই বাস্তবতায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতে সরকারি উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও কথিত সিন্ডিকেট ভাঙতে মোংলা ও এলেঙ্গায় নতুন এলপিজি বোটলিং প্ল্যান্ট স্থাপন করে দেড় বছরের মধ্যে বড় পরিসরে এলপিজি সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গ্যাস সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্পও বাতিল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭ লাখ ৫০ হাজার প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপন এবং নতুন গ্যাসলাইন নির্মাণ প্রকল্প। পরিবর্তে এলপিজি অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মুহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, রাজধানীতে গ্যাসের সরবরাহ দিন দিন কমছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। তিতাসের নিজস্ব নেটওয়ার্কেই প্রতি বছর গ্যাস সরবরাহ কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সরকারকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে।

তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি শিল্প এলাকার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। আগে আমিনবাজার, টঙ্গী, ডেমরা ও কদমতলী হয়ে যে পরিমাণ গ্যাস ঢাকায় প্রবেশ করত, বর্তমানে তা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এর প্রভাব ইতোমধ্যে ভোগ করছেন নগরবাসী। রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং এলাকার বাসিন্দা শামসুন্নাহার কণা জানান, দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে গ্যাস এলে তখনই পরিবারের চার সদস্যের জন্য রান্না করতে হয়। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এক সাবেক অতিরিক্ত সচিবও। তিনি জানান, গত দুই বছর ধরে তার বাসায় নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যায় না। এজন্য তিনি তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে ওই সময়ের বিল মওকুফের আবেদনও করেছেন।

শুধু আবাসিক নয়, শিল্প খাতেও গ্যাস সংকট মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ ও রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পতায় অনেক কারখানা আংশিক উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ।

পেট্রোবাংলা ও তিতাসের তথ্য বলছে, গত বছর দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে ১৮০ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ১৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে।

সার্বিক গ্যাস সরবরাহেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে দেশে আমদানিকৃত এলএনজিসহ দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৭৭ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে ২৭০ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট হলেও ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সরবরাহ নেমে এসেছে ২৫৬ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে।

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে সরবরাহ করা হয়েছিল ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। ২০২৪ সালে তা কমে ১৪৮ কোটি ৩০ লাখ, ২০২৫ সালে ১৫২ কোটি ১০ লাখ এবং চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৪৪ কোটি ১০ লাখ ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে আবাসিক খাতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ আরও কমে আসবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে সরে এসেছে সরকার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৭ লাখ ৫০ হাজার প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে পুরোনো পাইপলাইন বদলে ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন বসানোর ৮ হাজার ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্পও অনুমোদনের পর স্থগিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে দেশের এলপিজি বাজার বর্তমানে প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি কোম্পানিনির্ভর। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বাকি অংশ সরবরাহ করে ৩২টি বেসরকারি কোম্পানি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে এবং অন্যদের কাছে বিক্রি করে। ফলে কার্যত এই কয়েকটি কোম্পানির হাতেই বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতি বদলাতে মোংলায় ৬ দশমিক ৫ একর এবং টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় ৭ একর জমিতে নতুন এলপিজি বোটলিং প্ল্যান্ট ও সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে বিপিসি।

বিপিসি আরও জানিয়েছে, কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বছরে ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ সক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্থলভিত্তিক (ল্যান্ড-বেইজড) এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে জাহাজ থেকে জাহাজে (এসটিএস) এলপিজি স্থানান্তরের সুবিধাসহ একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এলাকায় ২৫ হেক্টর জমিতে বছরে ১২ লাখ টন ধারণক্ষমতার আরেকটি এলপিজি সংরক্ষণ ও বিতরণ টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারের আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন এলপিজির সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং দীর্ঘদিনের মূল্য নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের প্রভাবও কমে আসবে।