সমাজবিরোধী কোনো অপশক্তি যাতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশের বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেউ যাতে নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও পুরোহিত-সেবাইতদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্রকামী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে একটি নিষ্ঠুর শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই ‘কংসরূপী’ ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশ পুনর্গঠনের পালা।
বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানকে বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয় কোনো মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। দেশের বাইরে গেলে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে সংখ্যালঘু হয়ে যাই। তাই বিভেদের পরিচয় বাদ দিয়ে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয় যেন বিভেদ ও বৈষম্যের কারণ না হয়—এই উপলব্ধি থেকেই দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষকের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। আমাদের সবার গর্বিত পরিচয়—আমরা বাংলাদেশী।
বর্তমান সরকার কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র তার সামর্থ্য অনুযায়ী দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। একইভাবে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন। পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলোচনার ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা।
সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতাসহ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও তাঁর আদর্শের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সনাতন ধর্মের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় তাঁর জন্মের সময় সেখানকার শাসক ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।
হিন্দু সম্প্রদায়কে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এ দেশে সবার অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ পাশাপাশি তিনি বলেন, ধর্ম যার যার হলেও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।
প্রধানমন্ত্রী ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান। জন্মাষ্টমীর পর আসন্ন দুর্গাপূজাও যেন শান্তিপূর্ণ, স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপন করা যায়, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে আগাম শুভেচ্ছা জানান।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে পুষ্পস্তবক উপহার দেন, যা গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
অনুষ্ঠানে নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সারাদেশের পুরোহিত ও সেবাইতদের ব্যাংক হিসাবে এফটিএর মাধ্যমে সম্মানীর অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃগোষ্ঠীবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের সঞ্চালনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ এবং বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান ও ফরহাদ হালিম ডোনার, সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন শুক্রবার। জন্মাষ্টমীর প্রাক্কালে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত-সেবাইতদের সম্মানী প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।



