নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন—এ প্রশ্ন এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত বিষয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর তার উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার ইঙ্গিত, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই প্রধান আলোচ্য হতে পারে। এমনকি শনিবারই এ বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানা গেছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়টি এরই মধ্যে কমিটির সদস্যদের জানানো হয়েছে। বৈঠকের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে নিশ্চিত করে বলতে পারব।’
দলীয় সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের প্রোফাইল এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকেই এ পদে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
গত শুক্রবার ‘শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা’ না থাকার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, শনিবারের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে দল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। তাদের একজন বলেন, ‘শনিবারের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে আলোচনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত তো কারও একার নয়। দেশ, সরকার, দল ও জনগণ—সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেটি উপযুক্ত, সেটিই করা হবে।’
আলোচনায় যাদের নাম
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্পিকার ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেগম সেলিমা রহমান, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
আলোচনায় রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া মানবাধিকারকর্মী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নামও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যেসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা উচিত—এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল আটটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছরের মেয়াদ, সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার ভূমিকা, রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সর্বজনস্বীকৃত ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাগত ও কূটনৈতিক যোগ্যতা, বর্তমান সরকার ও দলের সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রপতির শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা—সবকিছুই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, ‘সব বিষয় বিবেচনায় নিলে বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া কাউকে এ পদে বিবেচনা করা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে বলে আমি মনে করি না। তবে ক্ষমতায় বসলে অনেকের মধ্যেই আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্তের পরিণতি সবসময় ভালো হয়েছে—এমনটি পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত নয়। তাই আবেগের চেয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, ‘আমার বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া উচিত, যার কোনো অগ্রহণযোগ্য ব্যাড রেকর্ড নেই, দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং যার দায়বদ্ধতা থাকবে রাষ্ট্রের প্রতি। একই সঙ্গে তার মেরুদণ্ডও হতে হবে শক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভাকে অনেক সময় অভিভাবকশূন্য মনে হয়। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, অবসরপ্রাপ্ত কোনো জ্যেষ্ঠ বিচারপতির মতো অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কেউ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকলে সরকার ও রাষ্ট্র—উভয়ই উপকৃত হতে পারে।’
মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, ‘আর যদি দলীয়ভাবে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হয়, তাহলে এমন একজন সিনিয়র নেতাকে বেছে নেওয়া উচিত, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং যার একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। তবে দুই যুগ আগে সরকারে থাকাকালীন বিএনপি যাদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছিল, নতুন করে এমন কোনো ব্যক্তিত্বকে এ পদে নির্বাচন করা উচিত হবে না।’
এদিকে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। মঙ্গলবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ অন্য নির্বাচন কমিশনাররা।



