tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়যেভাবে বিএনপি গড়ে তোলেন জিয়াউর রহমান

যেভাবে বিএনপি গড়ে তোলেন জিয়াউর রহমান

১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর নিজেকে রাজনীতির বাইরে থাকা একজন সৈনিক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সে সময় তিনি বলেছিলেন, রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তার সরকারও অরাজনৈতিক। তবে পরবর্তী তিন বছরে বদলে যায় তার ভূমিকা। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদ থেকে ধীরে ধীরে তিনি প্রবেশ করেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। নানা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল একাধিক ধাপ। এর মধ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা, গণভোট আয়োজন, অসামরিক উপদেষ্টাদের সরকারে সম্পৃক্ত করা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল—জাগদল এবং জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন উল্লেখযোগ্য। নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সময় তিনি বাম, ডান ও মধ্যপন্থি বিভিন্ন মতাদর্শের ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাজনীতিতে নতুন ও তরুণ মুখকে সামনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। দলের রাজনীতিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ নতুন ও তরুণ নেতৃত্বকে যুক্ত করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

‘একজন শ্রমিক’ হিসেবে আত্মপরিচয়

১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় জিয়াউর রহমান নিজেকে ‘একজন শ্রমিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার এই প্রবণতা পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

এরপর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়’ নিয়ে তিনি ঘোষণা করেন ১৯ দফা কর্মসূচি। এতে দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পের বিকাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এই ১৯ দফাই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

গণভোট ও রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণ

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই ভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ জিয়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

গণভোটের পর সরকার পরিচালনায় আরও বেশি অসামরিক ব্যক্তিকে যুক্ত করেন জিয়াউর রহমান। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংগঠকের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন। তাদের মধ্যে ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়া অন্যতম ছিলেন।

দল গঠনের প্রক্রিয়ায় তিনি একাধিক ব্যক্তি ও মাধ্যমকে কাজে লাগান। সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশুর দপ্তরে রাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের যাতায়াত ছিল। সেখানে অনেক সময় জিয়াউর রহমান তাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। পাশাপাশি তার একান্ত সচিব কর্নেল অলি আহমদও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংগঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

প্রথমে জাগদল, পরে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট

নিজের নামে সরাসরি রাজনৈতিক দল গঠনের আগে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’—জাগদল। তবে দলটি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যাশিত সাড়া ফেলতে পারেনি।

এরপর ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও গোষ্ঠীর নেতারা এতে যুক্ত হন। এরই মধ্যে ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান।

গ্রামে গ্রামে জনসংযোগ

রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে জিয়াউর রহমান শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপক জনসংযোগ চালান। তিনি দীর্ঘ পথ হেঁটে বিভিন্ন গ্রামে যেতেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের অভাব-অভিযোগ ও সমস্যার কথা শুনতেন।

এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রের একজন ব্যক্তি হিসেবে দূরে না থেকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বক্তব্য, সাংগঠনিক তৎপরতা ও জনসম্পৃক্ততা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

১ সেপ্টেম্বর বিএনপির আত্মপ্রকাশ

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতার পর জিয়াউর রহমান একটি একক রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। নতুন দলের নাম ও কাঠামো নিয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের মধ্যে তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী অন্যতম। তিনি প্রথমে দলের নাম ‘জাস্টিস পার্টি’ রাখার প্রস্তাব দেন। তবে নামটি পছন্দ না হওয়ায় তা গ্রহণ করেননি জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান মনে করতেন, দলের নামের সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি থাকা প্রয়োজন। পরে তিনি নিজেই ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ নামটি চূড়ান্ত করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়।

অবশেষে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রথমে ১৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি এবং পরে ১৯ সেপ্টেম্বর ৭৬ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং জাতীয় শক্তিকে সুসংহত করা।

গঠনতন্ত্র প্রণয়নে যারা ছিলেন

বিএনপির গঠনতন্ত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন নয়জন। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছাড়াও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, নাজমুল হুদা, মওদুদ আহমদ ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী উল্লেখযোগ্য।

ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির প্রথম মহাসচিব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় দলটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, যিনি ২০২৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।