tanaka
প্রচ্ছদলাইফস্টাইলনতুন প্রজন্মের মধ্যে কেন কমছে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সহ্যশক্তি?

নতুন প্রজন্মের মধ্যে কেন কমছে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সহ্যশক্তি?

 

একসময় স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা মানসিক ক্লান্তিকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব হিসেবে দেখা হতো। তবে বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী অনেক তরুণের মধ্যেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও মানসিকভাবে ক্লান্তি, ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়া, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা তথ্য প্রক্রিয়াকরণে আগের তুলনায় ধীরগতির মতো উপসর্গের কথা অনেকেই জানান। এসব সমস্যাকে অনেক সময় ‘ব্রেইন বার্নআউট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম হেলথ শটসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক জীবনযাত্রার নানা অভ্যাস মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ও মাল্টিটাস্কিং

স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সারাক্ষণ নোটিফিকেশন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা, একসঙ্গে একাধিক কাজ করা এবং সব সময় অনলাইনে থাকার অভ্যাস মস্তিষ্ককে অবিরাম উদ্দীপনার মধ্যে রাখে।

ভারতের নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ডা. নেহা পণ্ডিতার মতে, গভীর মনোযোগের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রামও প্রয়োজন।

এক কাজ থেকে দ্রুত অন্য কাজে বারবার মনোযোগ সরিয়ে নিলে মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হওয়া, তথ্য মনে করার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়া এবং মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের প্রভাব

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপর দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের সময় শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেখা, স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পড়তে পারে।

ফলে কোনো কাজে মন বসাতে সমস্যা, বারবার বিষয় ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ কিংবা মাথা ঝাপসা লাগার মতো অনুভূতি হতে পারে। এসব উপসর্গ সাময়িক হলেও দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কর্মক্ষমতা ও দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জীবনযাপনেও নজর দেওয়া জরুরি

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার সঙ্গে ঘুম, খাবার ও শারীরিক সক্রিয়তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ মানসিক সতর্কতা ও কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম স্মৃতি ও মানসিক কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে কমানো যায় মানসিক ক্লান্তি?

জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে এ ধরনের মানসিক ক্লান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও সুষম খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি।

একসঙ্গে অনেক কাজ করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ দেওয়া, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে বিরতি নেওয়া এবং কাজের সময়ের বাইরে কর্মসংক্রান্ত যোগাযোগের সীমা নির্ধারণ করাও উপকারী হতে পারে।

মানসিক চাপ কমাতে মাইন্ডফুলনেস, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মেডিটেশন চর্চা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাইরে সময় কাটানো, পছন্দের শখ চর্চা করা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক।

উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ

স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা মানসিক ক্লান্তিকে দীর্ঘদিন শুধু ব্যস্ততা বা কাজের চাপের ফল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। এসব সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে কিংবা দৈনন্দিন কাজ, ঘুম, আচরণ বা মেজাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কারণ একই ধরনের উপসর্গ কখনো কখনো পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যস্ত জীবনযাত্রায় শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।