কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুত তাজমীনের (১৩) মরদেহ যশোরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা। কীভাবে এই কিশোরীর মৃত্যু হলো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটন করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে তাজমীনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে গভীর রাতে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির কারণে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত তাজমীন। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। এ ঘটনায় সুমন নামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক চালককে আটক করেছে পুলিশ।
মেয়ের মৃত্যুর রহস্য জানতে চান মা
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমীনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল তাঁর। তখন তাজমীন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে এবং তাকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে বলেছিল। বান্ধবী ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও মেয়ে কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ওই বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে কেয়া খাতুন বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে।
রাতে বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন
তাজমীনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনি প্রায় বাকরুদ্ধ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমীন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাড়িতে থাকার কথা জানায়।
আবদুল আলীম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে মেয়ে তাঁকে মেসেজ পাঠানোর পাশাপাশি লাইভ লোকেশন দিয়ে সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে মেসেজ দেখে লোকেশন অনুযায়ী সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে পান বলে জানান তিনি।
মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং কারা তাকে হত্যা করেছে, তা জানতে চান আবদুল আলীম। তিনি পুরো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমীনের কোনো ভাইবোন ছিল না। সে পড়াশোনায় মেধাবী ছিল এবং বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পর কোথায় গিয়েছিল, তদন্ত করছে পুলিশ
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর বাড়ি ছাড়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল তাজমীন। একপর্যায়ে সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর সেখান থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নেমেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সেখান থেকে কীভাবে সে লালমাইয়ের ধানখেতে পৌঁছায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, তাজমীনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে তাজমীন হামলাকারীদের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
এ ঘটনায় তাজমীনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।



