tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়যন্ত্রাংশের ঘোষণা, ভেতরে চার বিলাসবহুল গাড়ি; মোংলায় এআইয়ে ধরা পড়ল কৌশল

যন্ত্রাংশের ঘোষণা, ভেতরে চার বিলাসবহুল গাড়ি; মোংলায় এআইয়ে ধরা পড়ল কৌশল

 

ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশের চালান দেখিয়ে মোংলা বন্দর দিয়ে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আনার চেষ্টা ধরা পড়েছে। গাড়িগুলোকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে আলাদা যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও কাস্টমস পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গাড়ির বিভিন্ন নম্বর ও চিহ্ন বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) তথ্য অনুযায়ী, চালানটিতে ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া গেছে। গাড়ি চারটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।

অথচ পুরো চালানটি ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালান আটকে দেয় কাস্টমস

কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪, যার তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে ১৬৪ প্যাকেজের এই চালানটি মোংলা বন্দরে আসে।

ঘোষনায় চালানটিতে ব্যবহৃত গাড়ির দরজা, ইঞ্জিন, গিয়ার, শক অ্যাবজর্বার, হেডলাইট, টেললাইট, বাম্পার, স্টিয়ারিংসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ থাকার কথা বলা হয়েছিল।

তবে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটির খালাস স্থগিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা। পরে ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ প্যাকেজ খুলে পরীক্ষা করা হয়।

পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়া হয়। গাড়ির অংশে থাকা নম্বর, স্টিকার, চিহ্ন, সেন্সর ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করার পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির সাহায্যেও গাড়িগুলোর মডেল শনাক্ত করা হয়।

আলাদা যন্ত্রাংশ নয়, ছিল গাড়ির বড় বড় কাঠামো

পরীক্ষায় দেখা যায়, চালানে সাধারণভাবে ব্যবহৃত বিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশের পাশাপাশি গাড়ির সামনের ও পেছনের সম্পূর্ণ কাঠামো, ছাদ এবং অন্যান্য বড় অংশ রয়েছে। এসব অংশের সঙ্গে তারের সংযোগ, সেন্সর ও প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশও যুক্ত ছিল।

এতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধারণা হয়, গাড়িগুলোকে একেবারে আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশে পরিণত না করে কয়েকটি বড় অংশে কেটে এনে চালানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করলে গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের বড় অংশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

যে চারটি গাড়ির পরিচয় মিলেছে

চালান থেকে শনাক্ত হওয়া গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালের যুক্তরাজ্যে তৈরি রেঞ্জ রোভার ভোগ। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আইয়ের সম্ভাব্য মূল্য ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০-এর বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে, জাপানে তৈরি টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের মডেল জিআরএস২০৪। গাড়িটির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

চারটি গাড়ি মিলিয়ে সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।

ইনভয়েসে মূল্য দেখানো হয় ৭ হাজার ৯৩৫ ডলার

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, পুরো চালানের ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। অন্যান্য খরচসহ শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

ঘোষিত পণ্যের ভিত্তিতে শুল্ক-কর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা। অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা।

এ কারণে প্রাথমিক অনুসন্ধানে কাস্টমস গোয়েন্দার ধারণা, কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাড়িগুলোকে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখিয়ে কম মূল্যে শুল্ক-কর পরিশোধের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রকৃত শুল্ক ফাঁকি কত, এখনো নির্ধারণ হয়নি

তবে এই চালানে প্রকৃত কত টাকা শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গাড়িগুলোকে সাধারণ যন্ত্রাংশ হিসেবে বিবেচনা না করে খণ্ডিত অবস্থায় থাকা সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা প্রয়োজন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গাড়ির মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, উৎপাদনের বছর, অবচয়সহ বিভিন্ন বিষয় হিসাব করে চূড়ান্ত শুল্ক-কর নির্ধারণ করা হবে। এরপরই সম্ভাব্য ফাঁকির পরিমাণ স্পষ্ট হবে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, কোনো পণ্য খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা হলেও যদি তাতে মূল পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বা ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বজায় থাকে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়।

ঘটনাটিতে আমদানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চালানটিকে এসকেডি অবস্থায় মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের বিষয়ে মতামত দিয়ে কাস্টম হাউস, মোংলায় প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করা, শুল্ক-কর ফাঁকি এবং যন্ত্রাংশের আড়ালে সম্পূর্ণ বা খণ্ডিত গাড়ি আমদানির মতো অনিয়ম প্রতিরোধে তাদের নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।