মশার কামড় মানেই আতঙ্ক—বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের ক্ষেত্রে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক পরীক্ষামূলক পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে ম্যালেরিয়া ছড়ানো মশার কামড়ই উল্টো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার Walter and Eliza Hall Institute of Medical Research (WEHI)-এর গবেষকেরা এমন একটি নতুন ‘কেমোভ্যাকসিনেশন’ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন, যা ম্যালেরিয়ার পরজীবীকে রোগ সৃষ্টি করার আগেই থামিয়ে দিয়ে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে তাকে চিনে নেওয়ার সুযোগ দেয়। গবেষণাটি সম্প্রতি Science সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
🧬 কীভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?
ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মশা কামড়ালে পরজীবী প্রথমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং যকৃতে গিয়ে কয়েক দিন ধরে বিকশিত হয়। এরপর তা রক্তে প্রবেশ করলে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ও উপসর্গ শুরু হতে পারে।
গবেষকেরা এই জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে লক্ষ্য করেছেন। WM382 এবং MK-7602 নামের পরীক্ষামূলক ওষুধ ব্যবহার করে তারা পরজীবীকে যকৃতের শেষ পর্যায়ে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ওষুধগুলো পরজীবীর plasmepsin IX ও plasmepsin X নামের গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমকে লক্ষ্য করে। ফলে পরজীবী রক্তে পৌঁছে রোগ সৃষ্টি করার আগেই থেমে যায়।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো—পরজীবী পুরোপুরি শরীর থেকে দ্রুত সরিয়ে না দিয়ে এমন পর্যায়ে আটকে রাখা হয়, যাতে ইমিউন সিস্টেম তাকে ভালোভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হতে পারে।
💉 মশার কামড়ই যখন ‘বুস্টার’
গবেষণায় ইঁদুরের শরীরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে সুরক্ষিত ইঁদুরগুলো দুই বছর পর্যন্ত ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা ধরে রাখতে পেরেছে। পরবর্তী সময়ে ম্যালেরিয়া বহনকারী মশার কামড় সেই প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতেও সাহায্য করেছে।
গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতিতে শরীরে শক্তিশালী ও বহুস্তরীয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এটি একটি নতুন কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
⚠️ তবে এখনই মশার কামড় নেওয়া যাবে না!
গবেষণাটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক হলেও এটি এখনো মানুষের জন্য প্রস্তুত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নয়। মূল গবেষণাটি প্রাক-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে ইঁদুরের ওপর করা হয়েছে। তাই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মশার কামড় ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া বা এমন মশার সংস্পর্শে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। মানুষের ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার সফলভাবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হলে ভবিষ্যতে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। যে মশা এতদিন ম্যালেরিয়ার বাহক হিসেবে পরিচিত, নিয়ন্ত্রিত ওষুধের সহায়তায় সেই মশার কামড়ই হয়তো একদিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে।



