tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশমেয়েকে হারিয়ে মায়ের আর্তনাদ, ‘দুধের শিশুও কি এ দেশে নিরাপদ নয়?’

মেয়েকে হারিয়ে মায়ের আর্তনাদ, ‘দুধের শিশুও কি এ দেশে নিরাপদ নয়?’

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুত তাজমীনের দাফন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তার মা কেয়া আক্তার। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা মিশে তাঁর কণ্ঠে ঝরেছে অসহায় প্রশ্ন। তাঁর অভিযোগ, এক বান্ধবীর প্ররোচনায় বাড়ি থেকে দূরে যাওয়া মেয়েটি শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের নির্মমতার শিকার হয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে সুমন নামে এক সিএনজিচালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

শুক্রবার দুপুরে নিহত তাজমীনের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মেয়েকে হারানোর শোক আর ধরে রাখতে পারেননি কেয়া আক্তার। বুকের ধনকে চিরবিদায় জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর বুক থেকে মেয়েকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এ দেশে ছোট শিশুরাও নিরাপদ নয় বলে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আর কার কাছে বিচার চাইবেন, তা বুঝতে পারছেন না। তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহ সব দেখেছেন এবং তিনিই মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার করবেন।

মেয়ের এমন পরিণতির জন্য এক বান্ধবীর সঙ্গকে দায়ী করেছেন মা। সাংবাদিকদের কাছে কেয়া আক্তার অভিযোগ করেন, ওই বান্ধবী নানা কথা বলে তাজমীনকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি মেয়েকে বারবার বাধা দিয়েছিলেন। এমনকি মেয়েকে নিরাপদে রাখতে ছয় মাস পর্যন্ত স্কুলে যেতে দেননি এবং ঘরে আটকে রেখেছিলেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বান্ধবীই তাজমীনকে প্রলুব্ধ করে কক্সবাজারে নিয়ে যায় বলে তাঁর দাবি।

বাড়ি ফেরার পথেই নিখোঁজ তাজমীন

৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল বলে জানান কেয়া আক্তার। তখন তিনি মেয়েকে কোথায় আছে জানাতে বলেছিলেন এবং নিজে গিয়ে নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাজমীন কুমিল্লা পর্যন্ত ফিরলেও আর বাড়িতে পৌঁছাতে পারেনি। মায়ের অভিযোগ, পথ থেকেই তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।

মেয়েকে হারিয়ে এখন কীভাবে বেঁচে থাকবেন, সেই প্রশ্নই বারবার করছেন তিনি। তাঁর কান্না ও আর্তনাদে দাফনস্থলে উপস্থিত মানুষের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে।

হোটেল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ

ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নামে তাজমীন। সেখানকার হোটেল নুরজাহানে রাত পৌনে ১২টার দিকে প্রবেশ করে সে। সিসিটিভি ফুটেজে রাত সোয়া ১২টার দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে পশ্চিম পাশের সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের দিকে যেতে দেখা যায় তাকে। এরপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি নির্জন ধানখেত থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের কাছেই একটি সিএনজি অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

স্থানীয় অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ

পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ও আশপাশের এলাকায় রাতের বেলায় কিছু সিএনজিচালকের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী ও ছিনতাইকারী চক্রের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, গভীর রাতে যাত্রীদের ফাঁদে ফেলে লুটপাট কিংবা নির্জন স্থানে নিয়ে অপরাধ সংঘটনের ঘটনা সেখানে ঘটে থাকে। তাজমীনের মৃত্যুর সঙ্গে এ ধরনের কোনো চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে সুমন নামে এক সিএনজিচালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ বা কোনো চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। ঘটনার রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা উদঘাটনের চেষ্টাও চলছে।

তবে তদন্ত ও গ্রেফতারের খবরেও মেয়েকে হারানোর শোক কিছুতেই কাটছে না কেয়া আক্তারের। তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কৈশোরে পা দেওয়া একটি মেয়েও কি নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা পাবে না? তাজমীনের মৃত্যু ঘিরে এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের প্রত্যাশা।