tanaka
প্রচ্ছদলাইফস্টাইলহাত-পায়ের পাঁচ পরিবর্তন কি লিভারের অসুখের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

হাত-পায়ের পাঁচ পরিবর্তন কি লিভারের অসুখের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

লিভারের রোগ শুরুতে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দেয় না। ফলে শরীরের ভেতরে সমস্যা বাড়লেও তা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। জন্ডিস, পেট ফুলে যাওয়া কিংবা হজমের গোলমাল লিভারের অসুখের পরিচিত লক্ষণ হলেও হাত ও পায়ের কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনও এ ধরনের রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া, নখের রং বদলানো, পা ফুলে যাওয়া কিংবা হাত-পায়ে ঝিনঝিনি অনুভব করার মতো উপসর্গ দেখা দিলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কিংবা সিরোসিসের মতো রোগ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ত্বক, নখ ও রক্তনালিতে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই লিভারের রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অন্য রোগ বা শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

লিভারের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হাত-পায়ের ৫ লক্ষণ

১. হাতের তালুতে অস্বাভাবিক লালচে ভাব

দুই হাতের তালু স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লাল হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পালমার এরিথেমা’ বলা হয়। কিছু দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো তালুতে উষ্ণতাও অনুভূত হয়। তবে সব ক্ষেত্রে ব্যথা বা চুলকানি থাকে না।

লিভারের রোগে হরমোনের ভারসাম্য ও রক্তনালির কার্যক্রমে পরিবর্তনের কারণে এমনটা হতে পারে। আবার অন্য শারীরিক অবস্থাতেও হাতের তালু লাল হতে পারে। তাই শুধু এ লক্ষণ দেখে লিভারের অসুখ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

২. নখের রং বা আকৃতিতে পরিবর্তন

নখের স্বাভাবিক রং ও গঠনে পরিবর্তন শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগে কিছু মানুষের নখ ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নখের অধিকাংশ অংশ সাদা দেখায়, আর প্রান্তের দিকে তুলনামূলক গাঢ় রং থাকে।

তবে নখের এমন পরিবর্তনের পেছনে লিভারের রোগ ছাড়াও রক্তস্বল্পতা, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা ছত্রাকের সংক্রমণসহ নানা কারণ থাকতে পারে। নখের রং বা গঠনে দীর্ঘদিন অস্বাভাবিকতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

৩. পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া

লিভারের কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে কমে গেলে শরীরে তরল জমার প্রবণতা বাড়তে পারে। রক্তে অ্যালবুমিন নামের প্রোটিনের মাত্রা কমে যাওয়াও এ সমস্যার একটি কারণ। এর ফলে পা ও গোড়ালি ফুলে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পেটেও তরল জমে পেটের আকার বেড়ে যায়।

কিছু লিভার রোগে ত্বকের চুলকানি বা রঙের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। তবে পা ফুলে যাওয়ার জন্য শুধু লিভারকে দায়ী করা যায় না। হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি কিংবা শিরার সমস্যাতেও এমনটা হতে পারে। হঠাৎ এক পা ফুলে গেলে এবং এর সঙ্গে ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

৪. ত্বকে মাকড়সার জালের মতো লাল রক্তনালি

ত্বকের ওপর ছোট লাল বিন্দু থেকে চারদিকে সূক্ষ্ম রক্তনালি ছড়িয়ে মাকড়সার জালের মতো আকৃতি তৈরি হলে তাকে ‘স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা’ বলা হয়। দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগ, বিশেষ করে সিরোসিসের ক্ষেত্রে এ ধরনের চিহ্ন দেখা যেতে পারে।

হরমোনের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ত্বকের ওপরের রক্তনালিগুলো এভাবে দৃশ্যমান হতে পারে। তবে ত্বকে দৃশ্যমান সব শিরা বা নীলচে-সবুজ রক্তনালি লিভারের রোগের লক্ষণ নয়। এ ধরনের পরিবর্তনের কারণ নির্ধারণে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন দরকার।

৫. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অসাড়তা কিংবা জ্বালাপোড়া

হাত-পায়ে বারবার ঝিনঝিনি অনুভব করা, অসাড় হয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া বা ব্যথা স্নায়ুর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। কিছু লিভার রোগের সঙ্গে স্নায়ুর ক্ষতির সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে লিভারের পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস সি-র মতো কিছু সংক্রমণের সঙ্গেও স্নায়ুজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তবে ডায়াবেটিস, ভিটামিনের ঘাটতি কিংবা স্নায়ুতে চাপ পড়ার মতো কারণেও হাত-পায়ে এসব উপসর্গ হতে পারে। তাই সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

হাত-পায়ের এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে লিভারের রোগ হয়েছে, তা নয়। তবে এর সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া কিংবা পেট ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক লিভার ফাংশন টেস্ট, অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা কিংবা আলট্রাসনোগ্রামের মতো পরীক্ষা দিতে পারেন। পরীক্ষার ফল ও রোগের পর্যায় অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

লিভারের অসুখ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।