বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং তাকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার কারণে দুজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষই সেখানে অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বীকার করেছে। ফলে ওই পরিস্থিতির প্রতিবাদ করে আখতারুজ্জামান যথার্থ কাজ করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। সমাবেশ শেষে সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ১ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্যকে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেওয়া এবং পরে রিমান্ডে পাঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে প্রায় ৩৪ জন সংসদ সদস্যসহ অনেক নেতা অবতরণের পর লাগেজ, জমজমের পানি ও ট্রলি না পেয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভিআইপি যাত্রী হিসেবে উত্তেজিত হয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কঠোর ভাষায় কথা বলা নাগরিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। আখতারুজ্জামানও সেই অধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, এজাহারে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়া, আঘাত করা ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ওই সময় সেখানে উপস্থিত থাকা তাদের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন জানিয়েছেন, আখতারুজ্জামান কারও গায়ে হাত তোলেননি কিংবা কাউকে নাজেহাল করেননি। ঘটনার সময় তিনি যা বলেছেন, তা ভিডিও ফুটেজেও দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার কারণে দুজনকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষই প্রমাণ করেছে যে সেখানে সমস্যা ছিল। সেই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এই মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে রিমান্ডের আদেশ বাতিল করে তাকে মুক্তি দিতে হবে।’
আখতারুজ্জামান স্বেচ্ছায় পুলিশের সঙ্গে গেছেন উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহসী মানুষের মতো নিজের বাসা থেকে পুলিশের সঙ্গে গেছেন। তার দাবি, তাকে গ্রেফতারের পেছনে শুধু বিমানবন্দরের ঘটনাই কারণ নয়।
আখতারুজ্জামানকে হেলমেট পরানোর বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী দুর্ধর্ষ অপরাধী, খুনি, ডাকাত কিংবা পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন আসামিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আখতারুজ্জামান কি দুর্ধর্ষ ডাকাত বা খুনি? তিনি তো স্বেচ্ছায় পুলিশের সঙ্গে গেছেন। তাহলে কেন তাকে হেলমেট পরানো হলো?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুই-তিন দিনের ঘটনায় যারা অপরাধী, তাদের গ্রেফতার করা হয়নি। অথচ একজন নিরপরাধ মানুষকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
জামায়াতকে ‘গুপ্ত’ বলার সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং তার দলের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং জামায়াত-শিবিরকে ‘গুপ্ত’ বলা হচ্ছে। দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির মুখে এ ধরনের বক্তব্য কতটা সমীচীন, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, জামায়াতকে ‘গুপ্ত’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে এসব বক্তব্যের রাজনৈতিক দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। তার দাবি, গত ২০-২২ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে রাজপথে ছিল এবং চারদলীয় জোটের সময়ও তারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। তখন জামায়াতকে ‘গুপ্ত’ বলা হয়নি।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘আপনার মা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবিতে বক্তব্য দিয়েছেন। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতিও সংসদে মাওলানা নিজামীর প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে এখন আপনারা কেন ভিন্ন কথা বলছেন?’
তিনি বলেন, জামায়াতকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার ও গণহত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে এর রাজনৈতিক দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। তার দাবি, ২০২৪ সালের আগে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় জামায়াতকে আক্রমণ করা হচ্ছে।
‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথার এত মিল কেন’
গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন তোলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের কথার এত মিল কেন?’ তিনি বলেন, দিল্লির সঙ্গে গোপনে কোনো যোগাযোগ তৈরি হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতকে এক করে দেখবেন না। জামায়াতে ইসলামী দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য রাজনীতি করছে।’
জাতিকে বিভক্ত করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করা হলে জনগণ তার জবাব দেবে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দল দেশের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার ভালো কাজ করলে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করবে। আর দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ হলে তার বিরোধিতা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী অপরিণত রাজনৈতিক দল নয়। দেশের স্বার্থে রাজনীতি করছে।’ সরকারের সঙ্গে ‘ফ্যাসিবাদী রাজনীতি’ বা ‘দিল্লির স্বার্থের’ কোনো ধরনের মিল থাকলে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তার বিরোধিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।



