ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনীতি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগসহ একাধিক দাবিতে মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, চলচ্চিত্র নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজসহ একাধিক বিশিষ্টজন।
মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর এবার রাজধানী দিল্লিমুখী আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ফের বড় কর্মসূচি পালন করা হবে। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘যন্তর মন্তর ২.০’।
গান্ধীজয়ন্তী উপলক্ষে শুক্রবার (২ অক্টোবর) শিবাজি পার্কে আয়োজিত কর্মসূচিতে হাজারো তরুণ-তরুণী অংশ নেন। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও তোলা হয়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে তরুণ প্রজন্ম দিল্লির পথে মিছিল করবে। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ যেখানে আন্দোলনকারীদের আটকে দেবে, সেখানেই প্রতিবাদের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হবে। তিনি এই কর্মসূচিকে অহিংস আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রত্যাশী নাগরিকদের এতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
মুম্বাই পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও শিবাজি পার্কে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক তরুণ জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে সমাবেশে যোগ দেন। পুলিশ সেখানে ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন করেছিল।
সমাবেশে সিজেপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে একাধিক দাবি তোলা হয়। সংগঠনের নেতারা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অভিজিৎ দীপকের অভিযোগ, সাম্প্রতিক লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনগুলোর আগে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এসব অভিযোগ অবশ্য নির্বাচন কমিশন ও সরকার পক্ষ থেকে খারিজ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা ক্ষমতাসীন বিজেপির ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ ধারণারও সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচনব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কারের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে ভোটারদের অংশগ্রহণ বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গান্ধীজয়ন্তীর কর্মসূচিতে রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষার্থী সংগঠনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরাও উপস্থিত ছিলেন। অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানা আজমি, চলচ্চিত্র নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ এবং সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানিসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
সমাবেশে দেশাত্মবোধক গান ও প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শিবাজি পার্ক এলাকা। তরুণদের বড় অংশের অংশগ্রহণে আন্দোলনটি নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে আয়োজকদের দাবি।
মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর সিজেপি এখন আন্দোলনকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে ফের অবস্থান কর্মসূচি হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে ভারতের রাজনীতিতে চলমান বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।



