কোনো মুসলিম নারীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ইচ্ছামতো ভাগ করার সুযোগ নেই। ইসলামী শরিয়াহতে প্রত্যেক ওয়ারিশের অধিকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তবে সম্পত্তি বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির কিছু দায়দেনা ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক বিষয় নিষ্পত্তি করতে হয়।
মায়ের মৃত্যুর পর তার স্বামী, মেয়ে এবং অন্য উত্তরাধিকারীরা কে কতটুকু সম্পদ পাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথমেই সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ ও জীবিত ওয়ারিশদের তালিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
বণ্টনের আগে যে তিনটি বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি সরাসরি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করা যায় না। প্রথমে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বিষয় সম্পন্ন করতে হয়।
দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয়: মৃতের কাফন, দাফন ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় খরচ তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে মেটানো হবে।
ঋণ ও দেনা পরিশোধ: মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ বা অনাদায়ী দেনা থাকলে তা আগে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে বকেয়া মোহরানাও অন্তর্ভুক্ত।
বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন: মৃত ব্যক্তি কোনো অ-ওয়ারিশের জন্য বৈধ ওসিয়ত করে গেলে তা মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
এসব ব্যয় ও দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদই মূলত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
সন্তান থাকলে স্বামীর অংশ
মৃত নারীর জীবিত সন্তান থাকলে তার স্বামী উত্তরাধিকার হিসেবে স্ত্রীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ (১/৪) পাবেন। অর্থাৎ সন্তান থাকলে স্বামীর নির্ধারিত অংশ ২৫ শতাংশ।
একমাত্র মেয়ে থাকলে
মৃত নারীর যদি কোনো ছেলে না থাকে এবং মাত্র একজন মেয়ে জীবিত থাকে, তাহলে ওই মেয়ে নির্ধারিত অংশ হিসেবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবে।
কুরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে—
وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ
অর্থ: ‘আর যদি (সন্তান) কেবল একটিই মেয়ে হয়, তবে সে অর্ধেক পাবে।’
—সুরা আন-নিসা, আয়াত ১১
একাধিক মেয়ে থাকলে
যদি মৃত নারীর দুই বা তার বেশি মেয়ে থাকে এবং কোনো ছেলে সন্তান না থাকে, তাহলে মেয়েরা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সম্পত্তি পাবে। এই অংশ তারা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: অবশিষ্ট সম্পত্তি
উদাহরণ হিসেবে, মৃত নারীর ওয়ারিশ যদি শুধু স্বামী ও একমাত্র মেয়ে হন, তাহলে স্বামী পাবেন ১/৪ এবং মেয়ে পাবেন ১/২। এতে মোট ৩/৪ সম্পত্তি বণ্টিত হওয়ার পর ১/৪ অংশ অবশিষ্ট থাকে।
এই অবশিষ্ট অংশ কারা পাবেন, তা শুধু স্বামী ও মেয়ের নির্ধারিত অংশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা যায় না। মৃত নারীর বাবা-মা, ভাইবোন বা অন্য কোনো যোগ্য ওয়ারিশ জীবিত আছেন কি না, তার ওপর অবশিষ্ট সম্পত্তির হিসাব নির্ভর করতে পারে। তাই বাস্তব ক্ষেত্রে সব জীবিত ওয়ারিশের তথ্য না জেনে চূড়ান্ত বণ্টন নির্ধারণ করা ঠিক নয়।
স্বামীর অংশের কুরআনি ভিত্তি
আল্লাহ তাআলা সুরা আন-নিসার ১২ নম্বর আয়াতে বলেন—
فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَقْنَ
অর্থ: ‘যদি তাদের কোনো সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে, তার এক-চতুর্থাংশ তোমাদের।’
—সুরা আন-নিসা, আয়াত ১২
ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় তাই সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে শুধু পারিবারিক সম্মতি বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে শরিয়াহর নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির সব জীবিত ওয়ারিশের তথ্য, দেনা, মোহরানা ও বৈধ ওসিয়ত যাচাই করে হিসাব করা উচিত।
কারণ একজন ওয়ারিশের অংশ নির্ধারণের সঙ্গে অন্য ওয়ারিশদের অংশও সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে নির্দিষ্ট কোনো পরিবারের সম্পত্তি বাস্তবে ভাগ করার আগে যোগ্য আলেম বা উত্তরাধিকার আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পূর্ণ হিসাব যাচাই করা নিরাপদ।



