তাওহীদের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দীর্ঘ জীবনের নানা অধ্যায়ে তাঁর পাশে ছিলেন হজরত সারা (আ.)। ঈমান, ধৈর্য, সতীত্ব ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার কারণে তাঁর জীবন মুসলিম নারীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে আল্লাহর কুদরতে রক্ষা পাওয়ার পর ইবরাহিম (আ.) দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে হিজরত করেন। ইরাকের উর থেকে হারান হয়ে তাঁরা সিরিয়া, ফিলিস্তিন পেরিয়ে মিসরের দিকে যাত্রা করেন। এই সফরেই সারা (আ.)-এর জীবনে একাধিক কঠিন পরীক্ষার ঘটনা ঘটে।
বিয়ের আগে সারা (আ.)-এর শর্ত
বর্ণনা অনুযায়ী, হারান অঞ্চলে ইবরাহিম (আ.) সারা (আ.)-এর সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি ছিলেন সৌন্দর্য ও গুণে অনন্য এবং মূর্তিপূজার পরিবর্তে তাওহীদের প্রতি বিশ্বাসী। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সারা (আ.) একটি অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এতে সম্মতি দেন—জীবনের সুখ-দুঃখে তিনি স্বামীর পাশে থাকবেন।
এই অঙ্গীকার পরবর্তী জীবনে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
মিসরে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি
মিসরে পৌঁছানোর পর ইবরাহিম (আ.) ও সারা (আ.) এমন এক শাসকের এলাকায় প্রবেশ করেন, যে বিবাহিত নারীদের প্রতি কুপ্রবৃত্তি পোষণ করত। বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো নারীর স্বামী জীবিত থাকলে তাকে হত্যা করে ওই নারীকে নিজের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করত সে।
এমন পরিস্থিতিতে ইবরাহিম (আ.) সারা (আ.)-কে ‘বোন’ হিসেবে পরিচয় দিতে বলেন। এর মাধ্যমে তিনি ঈমানের সম্পর্কের কথাই বোঝান। সহিহ বুখারির হাদিসে এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা
সারা (আ.)-কে যখন ওই শাসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যান এবং নিজের সতীত্ব রক্ষার জন্য দোয়া করেন।
তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন—
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ آمَنْتُ بِكَ وَبِرَسُولِكَ، وَأَحْصَنْتُ فَرْجِي إِلاَّ عَلَى زَوْجِي، فَلاَ تُسَلِّطْ عَلَيَّ الْكَافِرَ
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি যদি আপনার প্রতি ও আপনার রাসুলের প্রতি ঈমান এনে থাকি এবং আমার স্বামী ছাড়া অন্য সবার কাছ থেকে নিজের সতীত্ব রক্ষা করে থাকি, তবে এই কাফেরকে আমার ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ দেবেন না।’ —সহিহ বুখারি
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, শাসক যখনই সারা (আ.)-এর দিকে অসৎ উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়, তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন শাস্তি আসে যে সে অসুস্থের মতো ছটফট করতে থাকে। কয়েকবার চেষ্টা করেও সে সফল হতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত সারা (আ.)-কে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সেবার জন্য হাজেরা (আ.)-কে দেওয়া হয়।
ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে ফিরে সুসংবাদ দেন
সারা (আ.) ফিরে এসে দেখেন, ইবরাহিম (আ.) নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন। নামাজ শেষে ইবরাহিম (আ.) তাঁর কাছে পরিস্থিতির কথা জানতে চাইলে সারা (আ.) জানান, আল্লাহ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং হাজেরাকে তাঁর সেবিকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এরপর ইবরাহিম (আ.), সারা (আ.) ও হাজেরা (আ.) মিসর ত্যাগ করে ফিলিস্তিনের কানআন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।
বার্ধক্যে পেলেন সন্তানের সুসংবাদ
দীর্ঘ সময় সন্তানহীন থাকার পর আল্লাহ তাআলা সারা (আ.) ও ইবরাহিম (আ.)-কে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সুসংবাদ দেন। কুরআনে সারা (আ.)-এর বিস্ময়ের কথা এভাবে এসেছে—
قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ
অর্থ: ‘সে বলল, হায়! আমি কি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার স্বামীও বৃদ্ধ! নিশ্চয়ই এটি এক বিস্ময়কর ব্যাপার।’ —সুরা হুদ, ৭২
আল্লাহর কুদরতে তাঁদের ঘরে জন্ম নেন হজরত ইসহাক (আ.)। তাঁর বংশধারায় পরবর্তী সময়ে বহু নবী-রাসুলের আগমন ঘটে।
ঐতিহাসিক ও আহলে কিতাবের বর্ণনায় সারা (আ.)-এর ইন্তেকালের বয়স ১২৭ বছর বলা হয়েছে।
সারা (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা
হজরত সারা (আ.)-এর জীবন ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার অনন্য উদাহরণ। বিপদের মুহূর্তে তিনি হতাশ না হয়ে সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চেয়েছেন। স্বামীর সঙ্গে হিজরত থেকে শুরু করে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর দৃঢ়তা তাঁকে ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম ম



