tanaka

নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জি-৪-এর

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে জি-৪ জোট। ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান নিয়ে গঠিত এই জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা নিরশনে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সুপারিশ

ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা নিরশনে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সুপারিশ

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই উত্তেজনা প্রশমিত করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল পথে ফেরাতে করণীয় বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ওপর ভারতের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও তীব্র করেছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানো নয়াদিল্লির জন্য বড় ধাক্কা হলেও, এর ফলে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্পষ্টভাবে অবনতির দিকে গেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সীমান্ত বিরোধ, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। আইসিজির মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ভারতবিরোধী বক্তব্য থেকে বিরত থাকা এবং একই সঙ্গে ভারতেরও উচিত নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি বা সম্ভাব্য রাজনৈতিক অংশীদারদের অবমূল্যায়ন না করা। নির্বাচনের পর নয়াদিল্লির উচিত ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নতুন সরকারেরও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারকে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জমে থাকা ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার পতনে ভূমিকা রাখে। হাসিনাপরবর্তী সময়ে যদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়, তবে তা সহিংসতা উসকে দিতে পারে, সীমান্তকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে এবং উভয় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে একজন ভারতসমালোচক তরুণ কর্মীর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া এই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানো ভারতের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। কারণ, তার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। নয়াদিল্লির সমর্থন আওয়ামী লীগকে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পার হতে সহায়তা করে। তবে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও গভীর করে তোলে। হাসিনার পতনের পর উভয় দেশই সম্পর্ক মেরামতে ব্যর্থ হচ্ছে; বরং আক্রমণাত্মক বক্তব্য, বাণিজ্যিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ এবং সীমান্ত উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আইসিজি মনে করে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লি আপাতত পূর্ণমাত্রায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না। বরং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভারত। এই সুযোগ কাজে লাগাতে নির্বাচনের পর ভারতের উচিত হবে নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মনোভাব দেখানো এবং ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক শক্তিসহ সব অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত নির্বাচনী প্রচারে ভারতবিরোধী বক্তব্য পরিহার করা।

প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাব এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে সম্পর্ক প্রায়ই টানাপোড়েনের শিকার হয়েছে। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের যে ‘স্বর্ণযুগ’ শুরু হয়েছিল, তা সীমান্ত চুক্তি, বাণিজ্য সুবিধা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এগোলেও, বাংলাদেশে ধারণা তৈরি হয় যে ভারত একতরফা সুবিধা নিচ্ছে। ২০২৪ সালে হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

আইসিজির মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত মনে করেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার গঠন করলে উভয় দেশেরই উচিত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পর্ককে স্থিতিশীল পথে নেওয়া। একই সঙ্গে ভারতের উচিত হবে শুধু সরকার নয়, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, যাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কম পড়ে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচনে ভারতবিরোধী মনোভাবকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত অপরাধ দমন এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই মনে করছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ।