মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কালো মেঘ যখন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, তখনও আসন্ন বিশ্বকাপকে একটি ‘নিখুঁত বৈশ্বিক মহোৎসব’ হিসেবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। একদিকে ইসরায়েল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার তীব্র উত্তেজনা, অন্যদিকে ফিফা প্রধানের দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে আছে কেবল টিকিটের আকাশচুম্বী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকেই। ফলে বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা ও বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকির মাঝেও ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো দাবি করেন, ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড হবে ইতিহাসের সেরা ‘সামাজিক অনুষ্ঠান’। তবে বাস্তব পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ইতোমধ্যে নিজেদের আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ইরাক ফুটবল এসোসিয়েশন (আইএফএ)। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর পাশাপাশি কঠোর ভিসা নীতির কারণে দল ও কর্মকর্তাদের যাতায়াতও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
তবে সাক্ষাৎকারে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটকে প্রায় উপেক্ষাই করেছেন ফিফা সভাপতি। নিরাপত্তা ও লজিস্টিক জটিলতার প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপটি হবে অভাবনীয়। মাত্র চার সপ্তাহেই ৫০ কোটির বেশি টিকিটের অনুরোধ জমা পড়েছে, যা ফিফার ইতিহাসে নজিরবিহীন।’
ইনফান্তিনো আরও বলেন, ‘একসময় অনেকে বলতেন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের তেমন জনপ্রিয়তা নেই। কিন্তু সেই ধারণা এখন বদলে গেছে। এটি একটি বিশাল সফল আয়োজন হতে যাচ্ছে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ, ১৬টি শহর এবং তিনটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোকে নিয়ে এটিই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারের বিশ্বকাপ।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সামাজিক অনুষ্ঠান, যার সময় গোটা বিশ্ব যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াবে।’
তবে এই ফুটবল মহাযজ্ঞের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে খোদ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্ক টুর্নামেন্টকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
সম্প্রতি বিশ্বকাপে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুর শোনা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘ইরান (বিশ্বকাপে) খেললো কি খেললো না, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।’ ট্রাম্পের মতে, দেশটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।
গত সপ্তাহে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ফিফার একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সভায় ইরানের কোনো প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন না। এই অনুপস্থিতি চলমান রাজনৈতিক বিভেদ ও অনিশ্চয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ফলে বিশ্বকাপকে ঘিরে উচ্ছ্বাস যতই বাড়ুক, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েন যে এই বৈশ্বিক ক্রীড়া উৎসবের ওপর ছায়া ফেলতে পারে— তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
সূত্র: মানবজমিন।



