ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশটির প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহী। ইরান ইন্টারন্যাশনালের ইনস্টাগ্রাম পেজে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপটিতে প্রায় এক লাখ মানুষ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি মানুষ মন্তব্য করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের মন্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে অর্থনৈতিক সংকট, বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো।
অনেকেই বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় নতুন করে সংসার শুরু করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিজেদের দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে জীবনসঙ্গী বা সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া তাদের কাছে আরও বড় চাপ বলে মনে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল মুদ্রার প্রভাব
ইরান দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির মুদ্রার মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং আবাসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিভিন্ন নীতিও অর্থনৈতিক সংকটকে প্রভাবিত করছে। তবে সংকটের জন্য কোন কারণ কতটা দায়ী, তা নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে।
বিয়েকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত মনে করছেন অনেকে
বিয়ে থেকে দূরে থাকার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণই কাজ করছে না। জরিপে অনেক অংশগ্রহণকারী নিজেদের বিবাহবিচ্ছেদ বা ব্যর্থ দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন।
কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতিতে বিয়েকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। আবার বিবাহিতদের অনেকে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে তারা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। অনেকে সন্তান নিতে আগ্রহী হলেও এমন পরিবেশে তাদের বড় করতে চান না, যেখানে দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কিছু অংশগ্রহণকারী আরও কঠোর ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তান নেওয়াকে দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছেন। তাদের আশঙ্কা, সন্তানকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
পরিবেশগত সংকটও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
ইরানের সংকট শুধু অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি বায়ুদূষণ, পানির সংকট, বনাঞ্চলে আগুন এবং পরিবেশের অবনতিসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল নীতি, পরিবেশ সুরক্ষায় ঘাটতি, দুর্নীতি এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব এসব সংকটকে আরও তীব্র করছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাপন নিয়েও মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও হতাশা
জরিপে অংশ নেওয়া অনেকেই বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্কের কথা বলেছেন।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলন, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধও মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
ফলে অনেক ইরানির কাছে বিয়ে বা সন্তান নেওয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশটির ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা কেমন হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে গেছে।
জরিপে কারা অংশ নিয়েছেন
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৩২ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বড় অংশ ছিল ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সিদের, যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সিদের অংশগ্রহণ ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ।
১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের হার ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সিদের হার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। জরিপে ১২ হাজারের বেশি মন্তব্য জমা পড়েছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
সব মিলিয়ে জরিপের ফলাফল বলছে, ইরানিদের বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে শুধু পারিবারিক ব্যয়ের বিষয়টি নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তথ্যসূত্র: সামা টিভি



