tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকদল ও প্রতীক হারানোর সংকটে মমতা, ইন্দিরার ইতিহাস কি দিচ্ছে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত?

দল ও প্রতীক হারানোর সংকটে মমতা, ইন্দিরার ইতিহাস কি দিচ্ছে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত?

ভারতের রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—দুজনই দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। রাজনৈতিক জীবনে দুজনের পথচলায় কিছু মিল থাকলেও দলীয় সংকটের ধরন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সংগঠনের চরিত্রের দিক থেকে তাদের পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের সংকটের সূচনা হয়েছিল ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভি ভি গিরিকে সমর্থন করাকে ঘিরে দলের পুরোনো নেতৃত্বের সঙ্গে তার বিরোধ তীব্র হয়। একপর্যায়ে কংগ্রেস বিভক্ত হয়ে যায় এবং ইন্দিরার নেতৃত্বে আলাদা কংগ্রেস গড়ে ওঠে। এরপর ১৯৭১ সালের নির্বাচনে ‘গরিবি হটাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি বড় জনসমর্থন অর্জন করেন।

তবে তার রাজনৈতিক উত্থানও একসময় বড় ধাক্কা খায়। জরুরি অবস্থার পর ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী ও তার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পরাজিত হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে ইন্দিরার নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। জরুরি অবস্থার সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও অতিরিক্ততার জন্য ইন্দিরা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান সংকটের পটভূমি অবশ্য ভিন্ন। তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ভারতের নির্বাচন কমিশন ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে দলের পুরোনো নাম ও সংরক্ষিত প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আসন্ন উপনির্বাচনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকেই আলাদা নাম ও প্রতীক ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর জন্য ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক বরাদ্দ করা হয়। অপর গোষ্ঠী পেয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘খাম’ প্রতীক। এসব নাম ও প্রতীক আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তীভাবে প্রযোজ্য।

নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনী পরিচয়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিষয়টি এখন আইনি পর্যায়েও গড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মমতার জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তার ব্যক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের সংগঠন ও পরিচয় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এখন সেই দলের ভেতরেই যখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোষ্ঠীর দাবি সামনে এসেছে, তখন কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখা এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচন এই সংকটের প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা হিসেবে সামনে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে কোনো পক্ষই পুরোনো ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।

তবে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনা করতে গেলে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তির পার্থক্যটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। ইন্দিরার সামনে ছিল কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য, নেহরু পরিবারের উত্তরাধিকার এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন। বিপরীতে মমতার রাজনৈতিক পরিচয় মূলত দীর্ঘ আন্দোলন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতার জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু একটি নির্বাচনে লড়াই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলীয় সংগঠন ধরে রাখা, কর্মী-সমর্থকদের আস্থা বজায় রাখা, নতুন নাম ও প্রতীকের সঙ্গে ভোটারদের পরিচিত করা এবং পুরোনো দলীয় পরিচয় নিয়ে আইনি লড়াই—সবগুলো বিষয়ই একই সময়ে সামলাতে হচ্ছে তাকে।

ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ইতিহাস অবশ্য দেখায়, বড় ধরনের নির্বাচনী ধাক্কা বা দলীয় বিভাজনের পরও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের পেছনে নেতৃত্ব, সংগঠন, রাজনৈতিক বার্তা এবং জনসমর্থনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

মমতার ক্ষেত্রেও সামনে থাকা সময়টি তাই একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন দলীয় পরিচয় নিয়ে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া, সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার পরিণতি—এসব বিষয়ই আগামী দিনে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রাখে।