রবার্ট ল্যান্সিং ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে একটি ‘মেক-অর-ব্রেক’ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো—রূপান্তরকালীন এই প্রক্রিয়া কি একটি প্রতিযোগিতামূলক ও বৈধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হবে, নাকি বাংলাদেশ আবারও অস্থির ও হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার ফাঁদে আটকে পড়বে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। একদিকে ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের ঘিরে গড়ে ওঠা ইসলামপন্থী ব্লক—যার মধ্যে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)ও রয়েছে। পাশাপাশি ছোট দলগুলো নির্দিষ্ট আসনে ‘স্পয়লার’ বা ভোট বিভাজনকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোটপূর্ব সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে সহিংসতা ও ভয়ভীতির পরিবেশ। বিভিন্ন সূত্রে নির্বাচনকালীন হত্যা, সংঘর্ষ ও উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—ভোটার উপস্থিতি এবং আসনভিত্তিক ফলাফল অনেকাংশেই স্থানীয় পর্যায়ের বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করতে পারে।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দেলাওয়ারভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক রবার্ট ল্যান্সিং ইনস্টিটিউট। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দীর্ঘ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি প্রভাবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হলো ভারতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও তথ্যযুদ্ধ। একই সঙ্গে চীন বঙ্গোপসাগর-সংক্রান্ত প্রবেশাধিকার ও অবকাঠামো অর্থায়ন ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মনোযোগ স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং উগ্রবাদ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে।
ভোটপূর্ব প্রেক্ষাপট: কেন এই নির্বাচন ব্যতিক্রম
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যালটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘জুলাই সনদ’ সংস্কার প্যাকেজের ওপর গণভোট, যেখানে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্তর্ভুক্তির সংকট
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচন একদিকে একদলীয় আধিপত্যমুক্ত হয়ে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে, অন্যদিকে একটি বড় ভোটব্যাংক আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় পুরো ব্যবস্থাটি ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। এর ফলে দুটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে—
১) নির্বাচন-পরবর্তী বিতর্ক, ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ ও রাজপথে আন্দোলন
২) ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণে আগ্রহী শক্তির সহিংসতা ও নাশকতা
নিরাপত্তা পরিস্থিতি
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক সহিংসতা, কর্মী হত্যার খবর এবং উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কা সামনে এসেছে, যা সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রধান রাজনৈতিক শক্তিসমূহ
বিএনপি:
মূল বার্তা—নির্বাচনী বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হাসিনা-পরবর্তী শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন এবং শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি।
কাঠামোগত সুবিধা—আওয়ামী লীগবিরোধী জনমত এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে বিএনপি কার্যত বৃহত্তম বিকল্প শক্তি। একাধিক জরিপে দলটি এগিয়ে।
জামায়াত ও ইসলামপন্থী ব্লক:
মূল বার্তা—আইনশৃঙ্খলা, নৈতিক শাসন, সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা।
নির্বাচনী যুক্তি—তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি সমর্থন এবং ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত ভোটে আসন জয়ের সম্ভাবনা।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি):
২০২৪-পরবর্তী নাগরিক ও সংস্কারপন্থী শক্তির রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। কিছু এলাকায় ‘কিংমেকার’ ভূমিকা এবং জুলাই সনদ বিতর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় পার্টি ও ছোট দলসমূহ:
আসনভিত্তিক স্পয়লার, নির্বাচন-পরবর্তী জোট দরকষাকষির হাতিয়ার এবং বৈধতা নির্ধারণে প্রভাবক।
আওয়ামী লীগ নেটওয়ার্ক (নির্বাচনের বাইরে):
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক নেতা নির্বাসনে—বিশেষত ভারতে। অস্থিরতা বা জনবিমুখতা তৈরি হলে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ খোঁজার চেষ্টা চলছে।
বিদেশি শক্তির স্বার্থ
ভারত: সীমান্ত স্থিতিশীলতা, পানি ও যোগাযোগ, ভারতবিরোধী রাজনৈতিক উত্থান ঠেকানো। ফলাফল ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে দেখা গেলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে পারে।
চীন: অবকাঠামো ও বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলগত স্বার্থ—যে সরকারই আসুক, প্রকল্প দায়বদ্ধতা বহাল থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ: বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, মানবাধিকার ও উগ্রবাদ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ। সহিংসতা বাড়লে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির ইঙ্গিত।
উপসাগরীয় দেশসমূহ: প্রবাসী শ্রম, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ—সহিংসতা আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সম্ভাব্য ফলাফল ও দৃশ্যপট
বেশিরভাগ জরিপে বিএনপি প্রথম, জামায়াত উল্লেখযোগ্য এবং অন্যান্য দল অনেক পিছিয়ে। পাস্ট-দ্য-পোস্ট ব্যবস্থায় বিরোধী ভোট বিভাজিত হলে বিএনপি বড় আসন বোনাস পেতে পারে, তবে সহিংসতা প্রান্তিক আসনে ফল উল্টে দিতে পারে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল—বিএনপি বৃহত্তম দল হয়ে সরকার গঠনে এগিয়ে থাকবে। বিকল্প দৃশ্যপটে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ব্লক প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করলে জোট দরকষাকষি বাড়বে এবং সামাজিক নীতিতে ডানদিকে চাপ তৈরি হবে।
উপসংহার
নির্বাচনের বৈধতা নির্ভর করবে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। বিতর্কিত ভোট দেশকে আবারও পুরোনো অস্থিরতার চক্রে ফিরিয়ে নিতে পারে, আর তুলনামূলক শান্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক স্বাভাবিকতার পথ খুলে দিতে পারে।



