জাল এফওসি, নকল ইউডি এবং ভুয়া এইচএস কোড ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানির অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরভিত্তিক স্পাইডার গ্রুপের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন নিট বাজার লিমিটেড, বটম গ্যালারি এবং ট্রাউজার ওয়ার্ল্ডের নামে এসব কাপড় আমদানি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, সীমিত আয়তনের কারখানা, কম শ্রমিক এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গত ছয় মাসে বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের কাপড় আমদানির ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এসব কাপড়ের বড় অংশ খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে, যার ফলে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচিত তিন প্রতিষ্ঠানের নামে গত ছয় মাসে অন্তত ৭৮ কোটির বেশি গজ কাপড় আমদানি করা হয়েছে। বন্ড সুবিধার শর্ত অনুযায়ী এসব কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সম্প্রতি তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ-এর নজরে আসে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
বিজিএমইএ’র প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, আমদানিকৃত কাপড়ের পরিমাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর আয়তন, শ্রমিক সংখ্যা এবং যন্ত্রপাতির সক্ষমতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য রয়েছে। সংগঠনটির ইউডি কমিটি এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং ৭ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠায়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি পরিসংখ্যান—কেজি, গজ ও মিটার—সব দিক থেকেই অস্বাভাবিক। প্রায় ৯৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি কারখানা এবং ১,৫২৮ জন শ্রমিক দিয়ে এ পরিমাণ উৎপাদন বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ কাপড় ব্যবহার করতে হলে অন্তত ৩০টি বড় গার্মেন্টস কারখানার সমন্বিত উৎপাদন প্রয়োজন।
নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, আমদানিকৃত কাপড়ের বড় অংশ উচ্চমানের পলিয়েস্টার ও সিনথেটিক ফ্যাব্রিক, যা সাধারণত বোরখা, গাউন, হিজাব, ব্যাগ বা হোম টেক্সটাইল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব কাপড় নিট বা ওভেন গার্মেন্টস উৎপাদনে সাধারণত ব্যবহৃত হয় না—যা আমদানির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আমদানিকৃত কাপড় দিয়ে কী ধরনের পোশাক তৈরি করেছে এবং তা কোন দেশে রপ্তানি করেছে—তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি। কাটিং রেজিস্টার, প্যাকিং লিস্ট, শিপমেন্ট ডকুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জাল এফওসি নথিতে বন্ড কমিশনারেটের বিভিন্ন কর্মকর্তার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলো ওয়েবসাইটেও আপলোড করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দাদের এড়াতে ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার তৈরি করে রপ্তানির কাগজপত্র দেখানোর মাধ্যমে বন্ড সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর মো. সাইফুল ইসলাম (অব.) বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিয়েছে এবং সেই জবাবে তারা সন্তুষ্ট। তাই বিষয়টি আর এগোয়নি। তবে জবাবের বিস্তারিত বা নথিপত্র তিনি প্রকাশ করেননি।
অন্যদিকে স্পাইডার গ্রুপের ডিএমডি মো. রোকনউদ্দিন দাবি করেন, বিজিএমইএ’র চিঠিতে কিছু ভুল তথ্য ছিল এবং তারা আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করেছেন। লিখিত ব্যাখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি; সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের গোয়েন্দা সেলের প্রধান মোহাম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। সুনির্দিষ্ট কাগজপত্রসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



