tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ও স্ত্রীর ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক

ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ও স্ত্রীর ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা প্রায় ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ক্রোক করা সম্পদের তালিকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা জমি রয়েছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে ক্রোক করা সম্পদ যাতে বিক্রি, হস্তান্তর বা বিনিময় করা না যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুদকের তদন্তে গ্রাহকদের জমা রাখা অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করার মাধ্যমে আত্মসাৎ এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নামে অতিরিক্ত দামে জমি কেনার অভিযোগের সূত্র ধরে এসব সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে। সম্পদগুলো যাতে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা মালিকানা পরিবর্তন করা না হয়, সে আশঙ্কায় আদালতে ক্রোকের আবেদন করে দুদক।

নজরুলের নামে ২০ দলিলে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার সম্পদ

দুদকের নথি অনুযায়ী, মো. নজরুল ইসলামের নামে ঢাকা, ময়মনসিংহ, মুন্সিগঞ্জ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ২০টি দলিলে থাকা স্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব সম্পত্তির সরকারি দলিলমূল্য ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান-বারিধারা এলাকায় ৮ কাঠা, অর্থাৎ ১৩ দশমিক ২২২ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি ও জমি রয়েছে। এর দলিলমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।

ঢাকার উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে জমি ও প্লট রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকার হবিরবাড়ী মৌজা এবং মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীতেও জমি ও পুকুরের তথ্য পেয়েছে দুদক।

এ ছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায় প্রায় ৬ দশমিক ১৬ একর জমি রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, বন্দর ও সদর এলাকাতেও নজরুল ইসলামের নামে একাধিক আবাসিক প্লট ও জমির তথ্য মিলেছে।

স্ত্রীর নামে ১৯ কোটি টাকার বেশি সম্পদ

নজরুল ইসলামের স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামেও বিভিন্ন এলাকায় বিপুল স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের হিসাবে, তার নামে থাকা এসব সম্পত্তির সরকারি দলিলমূল্য ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। তার নামে মোট ২২টি দলিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

তাসলিমার সম্পদের মধ্যে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাইকপাড়া ও সলিমাবাদ এলাকায় প্রায় শতাধিক শতাংশ নাল জমি রয়েছে। রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকাতেও তার নামে বাড়ি এবং প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের একাধিক ফ্ল্যাটের তথ্য রয়েছে।

এ ছাড়া খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা ও সূত্রাপুর এলাকায় তার নামে জমি, প্লট ও ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম ও তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা স্থাবর সম্পদের সরকারি দলিলমূল্য সব মিলিয়ে ৫৭ কোটি ৬১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য দলিলে উল্লেখিত মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় আদালতের দ্বারস্থ দুদক

দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান সংশোধিত দুদক বিধিমালা, ২০১৯-এর ১৮ বিধির আওতায় সম্পদ ক্রোকের আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোক করা না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব সম্পত্তি বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা অন্য কোনো উপায়ে সরিয়ে ফেলতে পারেন। নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত সম্পদগুলো ক্রোকের নির্দেশ দেন।

যুক্তরাষ্ট্রেও সম্পদের সন্ধান

দেশের সম্পদের পাশাপাশি নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।

সংস্থাটির অনুসন্ধানে ২০১৫ সালে ৫ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি, যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের পর ওয়েলিংটনে একটি বাড়ি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

সাত মামলায় তদন্ত, আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন

গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ, কোম্পানির সম্পদ কেনাকাটায় অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা), ঢাকা-১ একাধিক মামলা করেছে। বিভিন্ন সময়ে করা এসব মামলার সংখ্যা সাতটি।

এর মধ্যে ২০২২ সালের ৮ মার্চ করা ১ ও ২ নম্বর মামলা, একই তারিখের ১৮ নম্বর মামলা, ওই বছরের ১২ আগস্টের ৪ নম্বর মামলা, ২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল ও ৯ মে করা ৪ নম্বর মামলা এবং ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই করা ৩৫ নম্বর মামলা রয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকা-১ কার্যালয়ের মামলা নম্বর ৩৫-এ নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই জিজ্ঞাসাবাদে তার নামে থাকা বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে দুদক।

দুদক সূত্রের দাবি, এসব মামলায় আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।