ইসলামের ইতিহাসে বহু আলেম, সাধক ও মনীষীর জীবন ও শিক্ষা যুগের পর যুগ মুসলিম সমাজকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁদের অন্যতম হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)—কাদেরিয়া সুফি ধারার সঙ্গে যাঁর নাম গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর স্মরণে হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে বিভিন্ন দেশে যে ইসালে সওয়াব, দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, তা ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ নামে পরিচিত।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ মূলত হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন, ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার স্মরণে আয়োজিত মাহফিলের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনুসারীদের কাছে দিনটি তাঁর জীবন ও আদর্শ স্মরণ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, দরুদ ও ইসালে সওয়াবের একটি উপলক্ষ।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ শব্দের অর্থ
‘ফাতিহা’ শব্দটি সাধারণভাবে সূরা ফাতিহা পাঠ, দোয়া, মোনাজাত কিংবা কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সওয়াবের আয়োজন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ‘ইয়াজদহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো।
অর্থাৎ ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলতে এগারোর ফাতিহা বোঝানো হয়। হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণে রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে অনুষ্ঠিত ইসালে সওয়াব ও দোয়ার মাহফিলকে এ নামে অভিহিত করা হয়।
কে ছিলেন আবদুল কাদির জিলানি?
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জন্ম ৪৭০ হিজরি বা ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জিলান অঞ্চলে বলে প্রচলিত। পরবর্তী সময়ে তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বাগদাদে যান। সেখানে তৎকালীন বিশিষ্ট আলেমদের কাছে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি ভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।
ধর্মীয় জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার প্রচারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বয়ান ও নসিহত শুনতে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হতেন বলে ঐতিহাসিক ও সুফি সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক বান্দাদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলেন—
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’
—সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২
সুফিবাদে তাঁর প্রভাব
আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর নাম কাদেরিয়া তরিকার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। তাসাউফের ইতিহাসে তাঁর শিক্ষা, নসিহত ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সুফি ঐতিহ্যে তিনি ‘গাউসুল আজম’ ও ‘বড়পীর’ নামে পরিচিত।
তাঁর নামে প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’ ও ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’। এসব রচনায় আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইবাদত, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাঁর শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং মানুষের চরিত্র, আমল ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা।
কেন পালন করা হয় ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম?
রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে তাঁর স্মরণে বিভিন্ন স্থানে কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দোয়া, আলোচনা ও দান-সদকার আয়োজন করা হয়। তাঁর জীবন, দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং তাঁর জন্য মাগফিরাত কামনা করা হয়।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সদকার গুরুত্ব ইসলামী শিক্ষায় স্বীকৃত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ: إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া বাকি সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’
—সহিহ মুসলিম
তবে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা, আয়োজনের ধরন বা শরয়ি বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা ও নেক আমলে গুরুত্ব দেওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
মূল শিক্ষা কোথায়?
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহমের তাৎপর্য শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন ও শিক্ষার দিকে তাকালে সততা, আমানতদারি, আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সুন্নাহ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাই তাঁর স্মরণে আয়োজিত কোনো মাহফিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে তাঁর জীবন ও শিক্ষাকে জানা এবং সেই শিক্ষা নিজের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করা। সত্য কথা বলা, অন্যের হক আদায় করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল জীবনযাপনের মধ্যেই তাঁর স্মরণকে অর্থবহ করার সুযোগ রয়েছে।
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম তাই অনুসারীদের কাছে কেবল একটি স্মরণদিবস নয়; বরং একজন বিশিষ্ট আলেম ও সুফিসাধকের জীবন, দ্বীনি শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ।



