tanaka
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে? ঘুম ও মৃত্যুর রহস্য কী বলে...

ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে? ঘুম ও মৃত্যুর রহস্য কী বলে কুরআন-হাদিস

প্রতিদিন রাতে আমরা ঘুমাতে যাই, আবার সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠি। বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, ঘুমের সময় মানুষের রূহের কী অবস্থা হয়? ঘুমের মধ্যে কি রূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়? কোথায় থাকে তা? আবার ঘুম ভাঙলে কীভাবে ফিরে আসে?

এ প্রশ্নগুলো কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়; বরং জীবন, মৃত্যু ও আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করে। পবিত্র কুরআনে ঘুম ও মৃত্যুর মধ্যে বিশেষ সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও ঘুমের সময় প্রাণ কবজ করা, তা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঘুমানোর আগে ও পরে পাঠ করার দোয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।

তাহলে ঘুমের সময় মানুষের রূহের কী হয়? এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিস কী জানায়? চলুন, নির্ভরযোগ্য দলিলের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।

১. রূহ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কতটুকু?

রূহ মানুষের অস্তিত্বের এক রহস্যময় বিষয়। মানুষ তার শরীর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলেও রূহের প্রকৃত স্বরূপ ও রহস্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ ۖ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا

অর্থ: ‘তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, রূহ আমার রবের আদেশঘটিত বিষয়। আর তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা আল-ইসরা: ৮৫)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, রূহের প্রকৃত স্বরূপ মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বাইরে। তাই এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই—এমন কোনো ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

২. ঘুমের সময় আল্লাহ মানুষের প্রাণ কবজ করেন

ঘুমের সময় মানুষের প্রাণের অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে সুরা আয-যুমারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

অর্থ: ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়। আর যারা মারা যায়নি, তাদের প্রাণও হরণ করেন ঘুমের সময়। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ আটকে রাখেন। আর অন্যদের প্রাণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আয-যুমার: ৪২)

এ আয়াত থেকে জানা যায়, মৃত্যু ও ঘুম—উভয় অবস্থাতেই আল্লাহ মানুষের প্রাণ গ্রহণ করেন। তবে দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়ে গেছে, আল্লাহ তার প্রাণ আটকে রাখেন। আর যার মৃত্যুর সময় এখনো আসেনি, তার প্রাণ ফিরিয়ে দেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

অর্থাৎ প্রতিদিনের ঘুম ও জাগরণ আল্লাহর কুদরত ও নিয়ন্ত্রণের এক বিশেষ নিদর্শন।

৩. ঘুম ও জাগরণ সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন

সুরা আল-আনআমেও ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ গ্রহণ এবং দিনের বেলায় জাগিয়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُم بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَىٰ أَجَلٌ مُّسَمًّى ۖ ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

অর্থ: ‘তিনিই রাতে তোমাদের প্রাণ গ্রহণ করেন এবং দিনে তোমরা যা করো, তা জানেন। অতঃপর দিনে তোমাদের জাগিয়ে তোলেন, যাতে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়। তারপর তাঁর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে, সে সম্পর্কে তিনি তোমাদের অবহিত করবেন।’ (সুরা আল-আনআম: ৬০)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ঘুমিয়ে পড়া কিংবা ঘুম থেকে জেগে ওঠা—সবকিছুই আল্লাহর ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের অধীন। মানুষের জীবন, মৃত্যু, ঘুম ও জাগরণ—কোনোটিই তাঁর ইচ্ছার বাইরে নয়।

৪. ঘুমের সময় রূহ কবজ ও ফিরিয়ে দেওয়ার কথা হাদিসে

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও ঘুমের সময় প্রাণ কবজ করা এবং ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এসেছে।

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাহাবিরা ফজরের নামাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করলে হজরত বিলাল (রা.) তাঁদের জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনিও ঘুমিয়ে পড়েন। পরে সূর্য ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) জেগে ওঠেন। এ সময় তিনি বলেন—

إِنَّ اللَّهَ قَبَضَ أَرْوَاحَكُمْ حِينَ شَاءَ، وَرَدَّهَا حِينَ شَاءَ

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন, তখন তোমাদের রূহ কবজ করে নিয়েছেন এবং যখন ইচ্ছা করেছেন, তখন তা ফিরিয়ে দিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৫, ৭৪৭১; সহিহ মুসলিম: ৬৮১)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঘুমের সময় মানুষের রূহ কবজ করা এবং ফিরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।

৫. ঘুমানোর আগে নবীজির (সা.) শেখানো দোয়া

ঘুমাতে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যাতে প্রাণ আটকে রাখা ও ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যাবে, তখন সে যেন এই দোয়া পড়ে—

بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي، وَبِكَ أَرْفَعُهُ، إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: বিসমিকা রব্বি ওয়াদাতু জানবি, ওয়া বিকা আরফাউহু। ইন আমসাকতা নাফসি ফারহামহা, ওয়া ইন আরসালতাহা ফাহফাজহা বিমা তাহফাজু বিহি ইবাদাকাস সালিহিন।

অর্থ: ‘হে আমার রব! আপনার নামেই আমি আমার পার্শ্ব রাখলাম এবং আপনার নামেই তা উঠাব। যদি আপনি আমার প্রাণ আটকে রাখেন, তবে তার প্রতি দয়া করুন। আর যদি তা ফিরিয়ে দেন, তবে আপনার নেক বান্দাদের যেভাবে হেফাজত করেন, সেভাবে তাকে হেফাজত করুন।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩২০)

এ দোয়ার মাধ্যমে মানুষ ঘুমানোর আগে নিজের জীবন ও প্রাণকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে। কারণ কেউ জানে না, পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙবে কি না।

৬. ঘুম থেকে জেগে ওঠার দোয়ায় মৃত্যুর স্মরণ

ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পাঠ করতেন। হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে বলতেন—

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।

অর্থ: ‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন। আর তাঁর কাছেই আমাদের পুনরুত্থান।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩১২)

এ দোয়ায় ঘুমকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করে আখিরাত ও পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। কারণ রাতে ঘুমাতে যাওয়া প্রত্যেক মানুষ জানে না, পরদিন সকালে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

৭. ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে?

এবার আসা যাক মূল প্রশ্নে—ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে?

পবিত্র কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ কবজ করেন। যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়নি, তার প্রাণ আবার ফিরিয়ে দেন। কিন্তু ঘুমের সময় রূহ ঠিক কোথায় অবস্থান করে, কোন স্থানে থাকে কিংবা শরীরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কীভাবে বজায় থাকে—এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিস্তারিত বিবরণ নেই।

তাই ঘুমের সময় রূহ আকাশে চলে যায়, নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করে কিংবা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়—এ ধরনের বক্তব্যকে নিশ্চিত ইসলামী তথ্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। এ বিষয়ে দলিলের সীমা অতিক্রম করে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়াও সমীচীন নয়।

আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা কুরআনে যেভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন, তা সত্য। এর প্রকৃত ধরন, অবস্থান ও রহস্য একমাত্র তিনিই ভালো জানেন।

৮. ঘুম ও জাগরণ থেকে আমাদের শিক্ষা

ঘুম শুধু শারীরিক বিশ্রামের মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন। প্রতিটি রাত আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর প্রতিটি সকাল নতুন করে জীবন পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

এ থেকে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত—

  • ঘুমানোর আগে দোয়া পড়া: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পাঠ করে ঘুমাতে যাওয়া।
  • আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা: নিজের জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে—এ বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা।
  • তাওবা ও ইস্তিগফার করা: ঘুমানোর আগে নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
  • ঘুম থেকে উঠে শুকরিয়া আদায় করা: নতুন একটি সকাল ও জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা।
  • আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া: প্রতিদিনের ঘুম ও জাগরণ থেকে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করা।

প্রিয় পাঠক, একটু চিন্তা করে দেখুন—প্রতিদিন রাতে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই। কিন্তু কেউ জানি না, পরদিন সকালে আমাদের ঘুম ভাঙবে কি না। কত মানুষ রাতে ঘুমাতে গিয়ে আর কখনো জেগে ওঠেনি! আবার কত মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন করে জীবন পেয়েছে।

পবিত্র কুরআন আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, ঘুম ও মৃত্যুর সময় মানুষের প্রাণ গ্রহণ করেন আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা ফিরিয়ে দেন, আর যার মৃত্যুর ফয়সালা করেন, তার প্রাণ আটকে রাখেন।

তাই ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ করুন, তাঁর কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের জীবনকে তাঁর কাছে সোপর্দ করুন। ঘুম থেকে জেগে উঠলে তাঁর শুকরিয়া আদায় করুন। মনে রাখবেন, প্রতিটি নতুন সকাল আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া নিজেকে সংশোধন করার, নেক আমল বাড়ানোর এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার নতুন সুযোগ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের ইমানের সঙ্গে জীবনযাপন, তাঁর স্মরণে রাত কাটানো এবং ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।