ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগেই পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন দেশে কয়েকজন মিলে একাধিক পোস্টাল ব্যালট গণনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো ব্যবস্থাটির স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিতর্ক স্তিমিত না হয়ে বরং আরও জোরালো হচ্ছে, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনাও।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) পোস্টাল ব্যালটকে প্রবাসী ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখালেও রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে ‘কারচুপির নতুন পথ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগে বিষয়টি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বাহরাইনের হিদ এলাকায় পোস্টাল ব্যালটের একটি ভিডিও ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এরপর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ উঠে আসে। বিএনপি নেতারা এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছেন। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর অবস্থান এবং নিবন্ধন বাতিল হওয়া দলের প্রতীক অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
অন্যদিকে জামায়াত এসব ভিডিওকে অপপ্রচার দাবি করে বলছে, তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। দলটির নেতাদের দাবি, বিদেশে জামায়াতের কোনো শাখা নেই; ফলে দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
পোস্টাল ব্যালটে ক্রমিক নম্বর থাকায় ভোটারদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, একই ঠিকানায় একাধিক ব্যালট পৌঁছানো কিংবা বিতরণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
ইসির কাছে ব্যাখ্যা চায় বিএনপি
প্রবাসে পোস্টাল ব্যালটের উন্মুক্ত ব্যবহারে উদ্বেগ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএনপি। কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিভিন্ন দেশে এক জায়গায় শতাধিক ব্যালট পাওয়ার ভিডিও সামনে এসেছে। এতে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। ব্যালট পাঠানোর পদ্ধতি, ভোটদান ও স্ক্যানিং প্রক্রিয়া এবং এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, পোস্টাল ব্যালটে বিএনপির প্রতীক মাঝামাঝি স্থানে রাখায় কাগজ ভাঁজ করলে তা চোখে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও এ বিষয়ে ব্যাখ্যা ও প্রতিকার দাবি করেছেন।
জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে ইসিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। তিনি দাবি করেন, প্রতীক বর্ণানুক্রমে সাজানো হয়েছে, এখানে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।
অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, পোস্টাল ব্যালটে অনিয়ম হলে ফৌজদারি মামলা, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী লাইভ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার কথাও জানান তিনি।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বাহরাইনের ভিডিওতে দেখা ব্যালটের সংখ্যা ছিল ১৬০টি এবং কোনো খাম খোলার প্রমাণ মেলেনি। বিষয়টি তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট দেশের ডাক বিভাগ।
বিশেষজ্ঞদের মত
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম মনে করেন, প্রথমবার প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোট চালুর শুরুতেই এমন ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাঁর মতে, কোনো কোনো আসনে পোস্টাল ভোট ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তাই ইসিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
নিবন্ধনের চিত্র
ইসির তথ্যানুযায়ী, পোস্টাল ভোটে সর্বাধিক প্রবাসী নিবন্ধন হয়েছে সৌদি আরবে—২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। এরপর মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান ও বাহরাইন। আসনভিত্তিক নিবন্ধনে ফেনী-৩ এবং চট্টগ্রাম-১৫ শীর্ষে, আর জেলাভিত্তিক নিবন্ধনে কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম এগিয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও উদ্বেগ বাড়তে থাকায় আসন্ন নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



