ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ নির্ধারণ হবে ইংল্যান্ড ও নরওয়ের মধ্যকার হাইভোল্টেজ কোয়ার্টার-ফাইনালের মাধ্যমে। মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করছে অপটার সুপার কম্পিউটার। পরিসংখ্যানের বিচারে সামান্য এগিয়ে থাকলেও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে ইংল্যান্ড।
অপটার ২৫ হাজার ম্যাচ-সিমুলেশনের ফল বলছে, যেকোনো উপায়ে সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ইংল্যান্ডের ৬২.৩ শতাংশ, যেখানে নরওয়ের সম্ভাবনা ৩৭.৭ শতাংশ। কোয়ার্টার-ফাইনাল শুরুর আগে করা পূর্বাভাসে সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় ফ্রান্স (৭৩.৯ শতাংশ), স্পেন (৬৯.৮ শতাংশ) এবং আর্জেন্টিনা (৬৯.৪ শতাংশ) ছিল ইংল্যান্ডেরও ওপরে।
নরওয়ের জন্য এবারের বিশ্বকাপ এক ঐতিহাসিক যাত্রা। প্রথমবারের মতো তারা কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার-ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। শেষ ষোলোতে বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা।
এ পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচের মধ্যে চারটিতে জয় পেয়েছে নরওয়ে। একমাত্র হারটি এসেছে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে কোচ স্টালে সোলবাকেন মূল একাদশে ১০টি পরিবর্তন এনে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়েছিলেন। পরে সেই সিদ্ধান্তের সুফল মেলে, কারণ নকআউট পর্বে আইভরি কোস্ট ও ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করে তারা।
আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই নজর কাড়ছে নরওয়ে। পাঁচ ম্যাচে ১২ গোল করার পাশাপাশি ৯ গোলও হজম করেছে দলটি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেমিফাইনালে ওঠার পথে অন্তত ১০ গোল করা এবং ১০ গোল হজম করার নজির রয়েছে কেবল ১৯৫৪ সালের জার্মানির।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযান ছিল উত্থান-পতনে ভরা। তবে শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে দারুণ জয়ের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে থ্রি লায়ন্সরা। অভিজ্ঞতার দিক থেকেও এগিয়ে ইংলিশরা। ব্রাজিল ও জার্মানির পর সবচেয়ে বেশি, ১১ বার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে খেলেছে ইংল্যান্ড।
তবে শেষ আটের রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। আগের ১০টি কোয়ার্টার-ফাইনালের মধ্যে মাত্র তিনটিতে জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। বাকি সাত ম্যাচেই একাধিক গোল হজম করে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম আর্লিং হালান্ড। নরওয়ের এই স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচেই গোল করেছেন। মাত্র ১৮টি শট থেকে করেছেন সাত গোল। ২০১৪ সালে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেসের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচে টানা গোল করার সুযোগ রয়েছে তার সামনে। ইউরোপীয় ফুটবলারদের মধ্যে সর্বশেষ এই কীর্তি গড়েছিলেন ১৯৭০ সালে জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলার।
হালান্ডের সাত গোলের মধ্যে চারটিই ছিল ম্যাচজয়ী। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি ম্যাচজয়ী গোল করেছেন শুধু পোল্যান্ডের গ্রেজেগোর্জ লাতো (১৯৭৪) এবং ইতালির সালভাতোরে স্কিলাচি (১৯৯০), দুজনেরই ম্যাচজয়ী গোল ছিল পাঁচটি করে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলেও দুর্দান্ত ধারাবাহিকতায় রয়েছেন হালান্ড। নরওয়ের জার্সিতে ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল করেছেন তিনি। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে টানা ১৪ ম্যাচে গোল করে এই সময়ে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭।
ইংল্যান্ডের ভরসা অবশ্য হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে হালান্ডের ঠিক পেছনেই রয়েছেন কেইন, যার গোল ছয়টি। ২০১৮ বিশ্বকাপেও তিনি ছয় গোল করেছিলেন। ইংল্যান্ডের হয়ে এক বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু গ্যারি লিনেকার, ১৯৮৬ সালে।
নকআউট পর্বে কেইনের রেকর্ডও ঈর্ষণীয়। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে ১২ ম্যাচে তার গোল ১১টি।
এদিকে মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল করা জুড বেলিংহ্যাম ইতোমধ্যে এই বিশ্বকাপে চার গোল করেছেন। ইংল্যান্ডের কোনো মিডফিল্ডারের এক বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে এগিয়ে ইংল্যান্ড। দুই দল এ পর্যন্ত ১২ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে আটটি ম্যাচ, নরওয়ে জিতেছে মাত্র দুটি। বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। সর্বশেষ চার দেখায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো গোলই করতে পারেনি নরওয়ে।
তবে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক রেকর্ড খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ইউরোপের দলের বিপক্ষে শেষ ছয়টি বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচের পাঁচটিতেই বিদায় নিয়েছে তারা। সর্বশেষ ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল ইংলিশরা।
অন্যদিকে বিশ্বকাপে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এখনও জয়ের দেখা পায়নি নরওয়ে। ছয় ম্যাচে তাদের রেকর্ড দুটি ড্র ও চার হার। নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে আগের দুটি ম্যাচেও পরাজিত হয়েছে তারা। তবে ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা পেছনে ফেলে এবার নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামবে হালান্ডরা।



