গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগের সময়ে পুলিশকে ঘিরে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ ছিল—এমন আলোচনা থাকলেও বর্তমানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, পুলিশের প্রতি মানুষের ভীতি কমার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তোয়াক্কা না করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
ফলে শত শত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ বুধবার রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাতের হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় মিরপুর এলাকা কার্যত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর ও পুলিশের গাড়ি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির এমন চিত্র নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
একের পর এক সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ
মিরপুরের ঘটনার আগে বৃহস্পতিবার রাতে ‘রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে’ অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।
এর পরদিন শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রপার্টিজে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। ওই ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র হামলা, আদাবরে আটতলা একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
পরপর এসব ঘটনায় সরকারের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে। বুধবার এক দিনেই বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানী থেকে চার শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার নয়
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এসব ঘটনায় সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী চরম অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি থেকে দেশ অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কোথাও বৃদ্ধি, কোথাও কমতির প্রবণতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যাদের অপরাধ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে বুধবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক হবে না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাচ্ছে এবং দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার করছে। এ কারণে সরকারের কোনো দায় বা ব্যর্থতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়মিত গ্রেফতার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সামনে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। তাঁর বক্তব্য, ‘দুর্বৃত্ত দুর্বৃত্তই, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না।’
পুলিশ বলছে, নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী পুলিশি তৎপরতা চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জনগণের সহযোগিতা নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শিশুর হত্যাকাণ্ডেও চাঞ্চল্য
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ইশায়াত। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পুলিশের মনোবল ও আইনের প্রয়োগে জোর দেওয়ার পরামর্শ
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তারা বলছেন, অপরাধ দমনে শুধু গ্রেফতার যথেষ্ট নয়; অপরাধের পেছনে থাকা সহযোগী ও মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি অপরাধীদের পেছনে থাকা মদদদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অতীতে অপরাধীরা আইন ও পুলিশের প্রতি যে ভয় পেত, বর্তমানে সেই ভয়ের সংস্কৃতি অনেকটাই অনুপস্থিত। এ কারণে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর মতে, অপরাধীদের গ্রেফতারের খবর সাময়িক স্বস্তি দিলেও অপরাধের মূল কারণ ও নেপথ্যের নেটওয়ার্কে আঘাত করা না গেলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধীরা যদি মনে করে তাদের পেছনে প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক কোনো চক্রের সমর্থন রয়েছে, তাহলে আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ কমে যেতে পারে।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনা না গেলে একসময় সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একদিকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক গ্রেফতার ও অভিযান চলছে, অন্যদিকে পুলিশের ওপর হামলা ও প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। ফলে শুধু গ্রেফতার নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা, জনআস্থা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অপরাধের নেপথ্যের শক্তিকে শনাক্ত করার বিষয়গুলোই এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হ



