রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার মুদি দোকানি শরীফুল হাতে ঘুরাচ্ছিলেন একটি ১০০ টাকার নোট। নোটটির এক কোণা আগুনে পোড়া। কাস্টমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার মনোযোগ ছিল ওই নোটটির দিকেই।
শরীফুল বলেন, “নেওয়ার সময় খেয়াল করিনি। পরে দেখি নোটের কোণা পোড়া। কেউ নিতে চায় না, আবার ফেলে দেওয়ারও উপায় নেই। এমন টাকা মাঝেমধ্যেই পাচ্ছি।”
কীভাবে পুড়ছে এসব টাকা? কারা পুড়াচ্ছে? কেনই বা অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি জেনেও ব্যবহার করা হচ্ছে জাতীয় মুদ্রা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক সেবনের সময় অসাবধানতায় আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছে কাগুজে নোট। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের সময় ধোঁয়া টানার জন্য নতুন ও শক্ত নোট ব্যবহার করার প্রবণতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বাজারে বাড়ছে পোড়া নোটের সংখ্যা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০ এমনকি ৫০০ টাকার নোটের কোণাও পোড়া অবস্থায় বাজারে ঘুরছে। এসব নোট নিতে অনেক দোকানি অনীহা দেখাচ্ছেন।
মতিঝিলের টং দোকানি নাহিদ হক বলেন, “৫, ১০ ও ২০ টাকার পোড়া নোট বেশি আসে। কিছুদিন আগে ১০০ টাকার একটি পোড়া নোট পেয়েছিলাম। পরে ব্যাংকে গিয়ে পরিবর্তন করতে হয়েছে।”
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা হাদিসুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন অনেক মানুষের সঙ্গে লেনদেন করি। অনেক সময় না দেখেই পোড়া নোট নিয়ে ফেলি। পরে অন্য ক্রেতারা নিতে চান না। ছোট ব্যবসায় একটি নোট আটকে গেলেও আমাদের জন্য ক্ষতি।”
ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত হচ্ছে নতুন নোট
মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইয়াবা সেবনের সময় অনেকেই নতুন কাগুজে নোট ব্যবহার করেন। নতুন নোট শক্ত হওয়ায় সেটি রোল করে ধোঁয়া টানতে সুবিধা হয়। ব্যবহার করার সময় আগুনের তাপে নোটের কোণা বা অংশ পুড়ে যায়।
এক ইয়াবাসেবী বলেন, “নতুন নোট শক্ত থাকে, তাই ব্যবহার করতে সুবিধা হয়। আগুনের তাপে অনেক সময় নোটের একপাশ পুড়ে যায়। তখন আর সেটি নিয়ে কেউ ভাবেও না।”
গ্রাহকের ভোগান্তি, ব্যাংকেও চাপ
পোড়া নোট পরিবর্তন করতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, আগের তুলনায় এখন আগুনে পোড়া বা কোণা পোড়া নোট বেশি আসছে।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু বকর বলেন, “এক-দুই বছর আগে ছেঁড়া-ফাটা নোট এলেও আগুনে পোড়া নোট তেমন দেখা যেত না। এখন এ ধরনের নোটের সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে ঢাকায়।”
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু তাহের জানান, অনেক সময় ইয়াবা সেবনের সময় আগুনের সংস্পর্শে আসা পোড়া নোট পাওয়া যায়।
ব্যাংকারদের মতে, নোটের ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করে তা বিনিময়ের ব্যবস্থা করা হয়।
মাদক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত। তাদের বড় একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত।
মানস সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, “মাদকাসক্তি এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা আসক্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।”
রাষ্ট্রেরও আর্থিক ক্ষতি
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ নতুন নোট ছাপায়। নোট ছাপানো, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “নোট ইয়াবায় পুড়েছে নাকি অন্য কারণে পুড়েছে, সেটি মূল বিষয় নয়। নোটের অবশিষ্ট অংশ গ্রহণযোগ্য হলে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়।”
তিনি বলেন, “নেশার জন্য টাকা পুড়িয়ে ফেলা শুধু মাদক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়ও।”
অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “একটি কাগুজে নোট শুধু কাগজ নয়, এটি রাষ্ট্রের সম্পদ। আগেভাগে নষ্ট হয়ে গেলে নতুন নোট ছাপানোর অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।”
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পোড়া নোটের ঘটনা শুধু একটি মুদ্রার ক্ষতি নয়, এটি মাদক বিস্তার ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি লক্ষণ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সচেতনতা—সবগুলো একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “ইয়াবার আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি নোট শুধু একটি কাগজের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বাজারব্যবস্থা ও নাগরিক আস্থাও।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জাতীয় মুদ্রার প্রতি মানুষের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো এবং সচেতনতা তৈরিই পারে এই নীরব ক্ষয় ঠেকাতে।



