-
মিয়ানমার সীমান্ত ঘিরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীপ্রধান নবী হোসেনের নেটওয়ার্ককে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছত্রচ্ছায়ায় আরও শক্তিশালী একটি ‘প্রক্সি’ শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন মূলত মাদক ও অস্ত্রের কারবারকে ঘিরে সক্রিয় থাকা নবী হোসেনের নেটওয়ার্ককে এখন সীমান্ত নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব বিস্তারের মতো সক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের বিরোধ ভুলে আরাকান আর্মির সঙ্গে নবী হোসেনের যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একই বলয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নবী হোসেনের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের দাবি, এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তার নেটওয়ার্কে আধুনিক ও ভারী অস্ত্রের সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি রকেটসহ ভারী অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেছে।
সূত্রগুলোর আরও অভিযোগ, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনা, জনবল বৃদ্ধি ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, ইরানকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর আদলে এমন একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছে, যার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ্যে না থাকলেও নির্দিষ্ট স্বার্থে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
আরসার আমির আতা উল্লাহ জুনুনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কারাগারে থাকায় সংগঠনটির বর্তমান কমান্ডার হিসেবে পরিচিত আবদুল খালেকসহ ক্যাম্পে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিতিশীলতা তৈরি, সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হতে পারে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছানোর তথ্য এবং সীমান্তের ওপারে বিপুল অস্ত্র মজুতের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
থানা লুটের অস্ত্র পৌঁছেছে নবী নেটওয়ার্কে
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীপ্রধান নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য ও তার ঘনিষ্ঠ সূত্র।
তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭টি পিস্তল ওই নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে। আরও ১০টি লুট হওয়া পিস্তলের একটি চালানও যেকোনো সময় নবী হোসেনের বাহিনীর হাতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র একের পর এক একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্কের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছাচ্ছে। অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নামও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু বশরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে নবী হোসেনের ইয়াবা ব্যবসার ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া রামুর গর্জনিয়া এলাকার গোলাম মওলা, ধুমধুমের ইলিয়াস মাঝিসহ আরও কয়েকজন লুট হওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে নবী নেটওয়ার্কে পৌঁছাতে সহযোগিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বিপুল অস্ত্র মজুতের অভিযোগ
গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, নবী হোসেনের নিয়ন্ত্রণে প্রায় তিন হাজার ভারী ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বলেও সূত্রগুলোর দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অস্ত্রভান্ডারে জি-৩, এম-১৬ ও একে-৪৭-এর মতো সামরিক রাইফেল, বিভিন্ন ধরনের বিদেশি পিস্তল এবং অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এছাড়া গ্রেনেড ও রকেটের মতো ভারী অস্ত্রও তার নেটওয়ার্কের কাছে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তাদের আরও দাবি, অস্ত্রের একটি বড় অংশ মিয়ানমারের তোতার দ্বীপসংলগ্ন সীমান্তের ওপারে মজুত রাখা হয়েছে।
২০২২ সালে নবী হোসেনকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার ভাই মো. কামাল গুলিতে নিহত হওয়ার পর ক্যাম্পের ভেতরে নবী গোষ্ঠী কিছুটা চাপের মধ্যে পড়েছে বলেও সূত্রের দাবি।
২০২২ সালেও উঠেছিল বিপুল অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ
নবী হোসেনের নেটওয়ার্কের বিপুল অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২২ সালের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার নেটওয়ার্কের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে কথিত ‘স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নবী হোসেনের ঘনিষ্ঠদের তথ্যের বরাত দিয়ে তখন দাবি করা হয়েছিল, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সহযোগিতায় বিপুল অর্থমূল্যের অস্ত্রের চালান কয়েক দফায় তার হাতে পৌঁছায়।
পরবর্তীতে নবী হোসেনের কথিত আস্তানায় অভিযান চালিয়ে এম-১৬, একে-৪৭, বিদেশি পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধারের তথ্যও সামনে আসে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, নবী হোসেনের কাছে তিন হাজারের চেয়েও বেশি অস্ত্র থাকতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই নবী হোসেনের গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তার বাহিনীতে বিপুলসংখ্যক সক্রিয় সদস্য রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে শোনা যায়।
কে এই নবী হোসেন?
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নবী হোসেনও বাংলাদেশে আসেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তার বাড়ি মিয়ানমারের মংডু শহরের ঢেকুবনিয়ায়। বাংলাদেশে এসে তিনি উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৮ নম্বর পশ্চিম ব্লকের একটি শেডে আশ্রয় নেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের শুরু থেকে মিয়ানমার হয়ে টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় ইয়াবার চালান আনার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। পরবর্তীতে ক্যাম্পে নিজের একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রোহিঙ্গা নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন সময়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বালুখালী ক্যাম্পের ৮ পশ্চিম, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর ক্যাম্পে তার নেটওয়ার্কের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদক ব্যবসায় কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী অর্থ ও কমিশনের বিনিময়ে তাকে সহযোগিতা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে মাস্টার মুন্না, ইসলাম, আবদুল হাকিম, আসাদ, জুবাইর, জাবু, মুমিন, জাকির ও শফিউল্লাহ বাহিনীর নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসার অর্থের একটি অংশ অবৈধ পথে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে নবী হোসেনের বিপুল সম্পদ থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
গ্রেফতারে নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবী হোসেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় গ্রেফতারে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় তার চলাচল ও নেটওয়ার্কের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, উখিয়া, কক্সবাজারের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নবী হোসেনের গ্রুপসহ বিভিন্ন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নবী হোসেনকে গ্রেফতারের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামের মতে, নবী হোসেনের কাছে বিপুল অস্ত্র থাকার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার ভাষ্য, এসব অস্ত্র সীমান্তবর্তী এলাকা কিংবা দেশের ভেতরে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
তিনি মনে করেন, শুধু নবী হোসেনকে গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়; অস্ত্রের উৎস, মজুতস্থল, সরবরাহের পথ এবং এর সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
চাইলে আমি এটাকে আরও তদন্তধর্মী/সাংবাদিকতার ভাষায়, অথবা অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য বেশি ক্লিকযোগ্য কিন্তু নিরপেক্ষ শিরোনাম ও সাবহেডসহ সংস্করণেও সাজাতে পারি।
ChatGPT is AI and can make mistakes.



