নগরের জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে সরকার ৩৬০ ডিগ্রি বা সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ নিতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, নগরের কোনো সমস্যা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সীমানা বা একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারসহ সব অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
ন্যাশনাল আরবান ফোরাম-২০২৬-এর ‘ফ্রম পলিসি টু অ্যাকশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘ফ্রম পলিসি টু অ্যাকশন’—এই ধারণাটি নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বপ্ন ও অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে দেশের নগরগুলোও। আজ যে ধরনের শহর গড়ে তোলা হবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের চেহারা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি নগর এলাকা। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নগর অঞ্চল থেকে আসে, যেখানে বসবাস করে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। তবে অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে আবাসন, গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপর বাড়ছে ব্যাপক চাপ। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, আয়বৈষম্য ও জলবায়ুজনিত অভিবাসন যুক্ত হয়ে নগর সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু বড় বড় শহর নির্মাণ নয়; বরং মানবিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা। এমন নগরব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নাগরিকরা সমান সুযোগ পাবেন, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জলাশয়, খাল, নদী, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন, মর্যাদা নিয়ে চলাফেরা করতে পারবেন এবং মৌলিক সেবা ও নাগরিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করতে পারবেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, নগরের উন্নয়ন কতগুলো উঁচু ভবন নির্মিত হয়েছে বা কত কিলোমিটার প্রশস্ত সড়ক তৈরি হয়েছে, শুধু তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। বরং নগরায়ণের ফলে মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে এবং সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী—সেটিই সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ নগর নীতিমালার কাঠামো শক্তিশালী করতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে একটি ভালো নীতিমালা প্রণয়নই শেষ কথা নয়; এটি বাস্তব কাজের সূচনা মাত্র। নীতিমালার কার্যকর, বাস্তবমুখী ও টেকসই বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
এ জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি খাত, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, আবাসন, যোগাযোগ, ড্রেনেজ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—এসব বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি নাগরিকের সামগ্রিক জীবনমান এসব সেবার সম্মিলিত প্রভাবের ওপর নির্ভর করে। তাই সমস্যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও বহুমুখী।
‘নাগরিক সমস্যা সমাধানে আমরা ৩৬০ ডিগ্রি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করতে চাই,’ বলেন তিনি।
নাগরিকদের চাহিদা পূরণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও নিজস্ব রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী শিক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক গণপরিবহন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত হবে।
‘এসব কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার,’ বলেন মাহ্দী আমিন।
নগর পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যে অবকাঠামো, জনজীবন ও মানুষের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। খাল-বিল, নদী-নালা, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ অঞ্চলকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত নগর কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ন্যাচার-বেসড সল্যুশন’ বা প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা ও তীব্র তাপদাহ মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে শহরগুলোকে মানুষের বসবাসের জন্য স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।
নীতিমালা প্রণয়নে সাধারণ মানুষের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, যারা প্রতিদিন নগরের নানা সমস্যার সঙ্গে বসবাস করছেন, তাদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। তৃণমূলের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৈশ্বিক জ্ঞান ও সফল উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে হবে। কোনো সিদ্ধান্ত ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিতে হবে।
সরকার যে ধরনের শহর গড়ে তুলতে চায়, তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সুযোগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হয়ে উঠবে বলেও জানান তিনি। এসব শহরে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, মূল শহরের সঙ্গে আশপাশের অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ ও সংযোগ বাড়াতে হবে, যাতে উন্নয়নের সুফল কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্য দায়িত্বশীল বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) প্রয়োজন।
নাগরিক সেবা আরও কার্যকর করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন মাহ্দী আমিন। তবে তিনি বলেন, প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম; সরকারের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শহর গড়ে তোলার পাশাপাশি শহরকে মানবিক করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষায়, এমন একটি মানবিক শহর গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
নগর উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ জটিল ও বহুমাত্রিক উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনে তৈরি অচলাবস্থা রাতারাতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার দৃঢ় ও সুস্পষ্ট।
তিনি বলেন, বাস্তবমুখী ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে নগরের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকার সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মাহ্দী আমিন বলেন, সরকারের নেওয়া নগর নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বের সেরা চর্চাগুলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশের শহরগুলোকে আরও আধুনিক, নিরাপদ, টেকসই ও মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নগর উন্নয়ন নিয়ে অংশীদারদের মধ্যে এই সহযোগিতা, মতবিনিময় ও সমন্বয়ের ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।



