tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশদীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে অনিয়মিত ঘুম, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব অভ্যাস

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে অনিয়মিত ঘুম, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব অভ্যাস

কর্মব্যস্ত জীবনে সময়ের অভাবে অনেকেই খাবার খাওয়া, শরীরচর্চা ও ঘুমের নিয়ম ঠিক রাখতে পারেন না। দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করা, দুপুরের খাবার এড়িয়ে যাওয়া কিংবা রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়ার মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এসবের সঙ্গে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিরও সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে কর্মজীবীদের এমন কিছু অভ্যাসের কথা তুলে ধরা হয়েছে। শারদাকেয়ার-হেলথসিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক চিকিৎসক নিরাজ কুমারের মতে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সুষম খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

দীর্ঘ সময় বসে কাজের নেতিবাচক প্রভাব

খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন, রক্তে শর্করা ব্যবহার এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের মতো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময় বসে কাটালে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চিকিৎসক নিরাজ কুমারের মতে, অনেক কর্মজীবীর শারীরিক কার্যক্রম মূলত কর্মস্থলে যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার কারণে তাঁদের শরীর পর্যাপ্ত নড়াচড়ার সুযোগ পায় না।

শরীরের পেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ অবস্থায় ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২৫ সালের ডায়াবেটিস অ্যাটলাসের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী আনুমানিক ৯ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। বয়স ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং খাদ্যাভ্যাসও এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

খাবারের সময় অনিয়ম করলেও বাড়তে পারে ঝুঁকি

কাজের চাপের কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে খাবার খেতে পারেন না। কেউ দুপুরের খাবার বাদ দিয়ে বিকেলে বারবার হালকা খাবার খান, আবার কেউ রাতে অনেক দেরিতে রাতের খাবার খান। নিয়মিত এমন অনিয়ম খাদ্যাভ্যাস ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

চিকিৎসক নিরাজ কুমার সেল মেটাবলিজম সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে ক্ষুধা বৃদ্ধি এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া জেগে থাকা অবস্থায় শরীরের শক্তি ব্যয়ের হারও কমে যেতে দেখা গেছে।

এ কারণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সময় কী খাচ্ছেন এবং কতটা খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি কখন খাচ্ছেন, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

দৈনন্দিন রুটিনে আনুন ছোট পরিবর্তন

ব্যস্ত কর্মজীবনে সব অভ্যাস একসঙ্গে পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে। তবে নিয়মিত কিছু ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

চিকিৎসক নিরাজ কুমারের পরামর্শ অনুযায়ী, একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ানো এবং বিরতির সময় কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করা উচিত। একই সঙ্গে দুপুরের খাবার এড়িয়ে না গিয়ে বাড়ি থেকে সুষম খাবার নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

ঘুমের ক্ষেত্রেও নিয়ম মেনে চলা জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত। দ্রুত হাঁটা এর একটি সহজ উদাহরণ। নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ

রক্তে শর্করা, রক্তচাপ কিংবা কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলেও অনেক সময় শুরুতে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন অজানা থেকে যেতে পারে।

এ কারণে বয়স, ব্যক্তিগত চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়মিত রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা সহজ হয়।

কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা থাকলেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করা প্রয়োজন। নিয়মিত হাঁটাচলা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকার অভ্যাস কমানো দীর্ঘ মেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগেভাগে সচেতন হওয়া সম্ভব।